স্টেলার প্যারালাক্স (Stellar Parallax) পর্ব-১

ছোটবেলায় যখন বাসে করে দূরে কোথাও যেতাম মনে হতো কাছের জিনিসগুলি খুব দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে অথচ দূরের ধানক্ষেত, আরো দূরে কিছু কৃষক, তারো দূরে গাছপালা ধীরে ধীরে তাদের গতি কমিয়ে ফেলছে। কিন্ত রহস্য এখানেই শেষ হয়না, ধীরে ধীরে যদি গতি কমেই যায় তাহলে একসময় সবচেয়ে দূরের বস্তুটি একেবারে থেমে যাবার কথা ছিল!! কিন্ত নাহ এমনটা হলোনা। চাঁদ তো দেখি আমার সাথে সাথেই চলছে!! যতদূর মনে পরে তখন একটু আধটু ঐকিক নিয়মে অংক করতে পারতাম। তাই রহস্য উৎঘাটন এর চেষ্টা না করে “ওই তুই আমার সাথে আসবি না!” বলেই রাগ থামিয়েছি অথবা কখনো কখনো “আম্মু, কেন চাঁদটা আমার সাথে সাথে আসছে ?” উত্তরে কি বলত তা মনে নেই কিন্ত একটা গভীর আকাঙ্খা থেকেই যেত। কেন আজ এই অদ্ভুত ছেলেমি? আর এই স্টেলার প্যারালাক্স এর ব্যাপারটাই বা কি!

এটা বলার আগে আর একটা মজার ঘটনা বলি। একদিন টেলিভিশনে দেখলাম যে, কোনো বস্তু আমাদের থেকে কতটা দূরে তা নির্ণয় করার জন্য হাত সোজা করে বৃদ্ধাঙ্গুলি বস্তুর দিকে তাক করিয়ে একবার বাম চোঁখ খোলা রেখে ডান চোঁখ বন্ধ করতে হবে এরপর ডান চোখ খোলা রেখে বাম চোঁখ বন্ধ করতে হবে (ছবি- ২)। লক্ষ করলে দেখবেন যে আপনার অঙ্গুলটি সামান্য বাম দিকে সরে এসেছে এবং মজার বিষয় হল বিভিন্ন দূরত্বের বস্তুর জন্য এই আপাত সরণ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে(কারণ আমরা ব্যাকগ্রাউন্ড বদলিয়ে ফেলেছি)।টেলিভিশনের চশমা পড়া লোকটি আরো বললেন যে এই আইডিয়া ব্যবহার করেই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বস্তুর দুরত্বের পরিমাপ করেন।

ব্যাস, আমিও মাঠে নেমে গেলাম। সারাদিন যা কিছু চোখে পড়ল সবকিছুই চোঁখ মেরে দেখেছি। কিন্ত দিনশেষে একটা বিষয় উপলদ্ধি করলাম যে দূরের বস্তু গুলির জন্য অঙ্গুলের আপাত সরণ প্রায় একই রকম। মানে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষের জন্য যে আপাত সরণ, চাঁদের আপাত সরণও প্রায় একই রকম। মানে আরো বুঝলাম, ঝামেলা কিছু আছে! ভাবনা এখান থেকেই থাক, এখন একটু গাণিতিকভাবে চিন্তা করা যাক।

স্টেলার প্যারালাক্স (Stellar Parallax) কি?

ওপরের যে ঘটনা গুলো বললাম সেসবের সাথে “স্টেলার প্যারালাক্স” নামটি জড়িত। স্টেলার প্যারালাক্স এর অর্থ হলো “নাক্ষত্র লম্বন”। বাংলা নামটি কেমন যেন কড়মড়ে তাই ইংরেজি নামটাই ব্যবহার করছি। তবে স্টেলার প্যারালাক্স সম্পর্কে জানার আগে এটা জানা জরুরি যে প্যারালাক্স জিনিসটা আসলে কি?

প্যারালাক্স (Parallax) কি?

যখন কোনো বস্তুকে তার চাইতে দূরের কোনো স্থির রেফারেন্স ফ্রেম এর সাপেক্ষে ভিন্ন অবজারভেশন পয়েন্ট থেকে বিবেচনা করা হয় তখন বস্তুর আপাত সরনের জন্য যে কোন উৎপন্ন সেটি “প্যারালাক্স (Parallax)” নামে পরিচিত।

This image has an empty alt attribute; its file name is image-11.png
ছবি – ১

কিছুক্ষন আগে আমরা হাতের অঙ্গুলির যে আপাত সরণের কথা বলছিলাম তা থেকেই মূলত প্যারালেক্সের ধারণা
নিচের ছবি লক্ষ্য করি:

This image has an empty alt attribute; its file name is image-13.png
ছবি – ২

হাতের আঙুলের আপাত সরণকে যদি আমরা কোণে প্রকাশ করি তাহলে সেটিই হলো “প্যারালাক্স কোণ (Parallax Angle)”। এখানে একটি বিষয় খুব ভালো ভাবেই বোঝা যায় যে প্যারালাক্স, মানে উৎপন্ন কোণের পরিমান দুটো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। একটি হলো আমার দু’চোঁখের মধ্যেকার দূরত্ব আর অন্যটি হলো আমার হাতের দৈর্ঘ্য। বলে রাখা ভালো যে, দুই অবজারভেশন পয়েন্ট এর মধ্যেকার দূরত্বকে “বেসলাইন (Baseline)” বলা হয়।

চলো একটু মজা করা যাক, মনে কর তুমি বিশাল বড় একটা দৈত্য, তোমার মাথা অনেক বড় এজন্য চোঁখ দুটির মধ্যেকার দূরত্বও অনেক বেশি কিন্ত হাত দুটো আগের মতোই আছে!!!এবার আগের মত একই কাজ করলে দেখবে যে এবার প্যারালাক্স কোন আগের চাইতে বড় হয়ে গিয়েছে (ছবি-৩)

অর্থাৎ “প্যারালাক্স কোন ∝ বেসলাইন” ……………………… (equ-1)

আবার, একটু কল্পনায় ভাব যে তুমি অনেক বড় একটা দৈত্য কিন্তু তোমার মাথা আগের মতই আছে তবে হাত গুলো বিশাল লম্বা লম্বা!! এবার তুমি দেখবে যে প্যারালাক্স কোন আগের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে (ছবি-৪)

This image has an empty alt attribute; its file name is image-14.png
ছবি – ৩
This image has an empty alt attribute; its file name is image-15.png
ছবি – ৪

অর্থ্যাৎ এক্ষেত্রে, প্যারালাক্স কোন ∝ 1/ (আঙ্গুলের দূরত্ব) …………… (equ 2)
এখানে আঙুলের দূরত্ব বলতে বস্তুর দূরত্বকে বোঝানো হয়েছে,

তাহলে ইকুয়েশন ১ ও ২ নং হতে পাই ,
প্যারালাক্স কোন ∝ বেসলাইন (Same Unit) / বস্তুর দূরত্ব (Same Unit)
বা, প্যারালাক্স কোন = ধ্রুবক x বেসলাইন (Same Unit) / বস্তুর দূরত্ব (Same Unit)

এখন যদি আমরা বেসলাইন আর বস্তুর দূরত্বকে একই এককে প্রকাশ করি তাহলে ধ্রুবকের মান ১ হয়ে যাবে এবং প্যারালাক্স কোণের মান রেডিয়ান এককে আসবে। আবার যদি আমরা প্যারালাক্স কোনকে ডিগ্রিতে প্রকাশ করতে চাই তাহলে এই ধ্রুবকের মান হবে ৫৭.৩°
অর্থাৎ,
তখন, প্যারালাক্স কোণ = ৫৭.৩° x [বেসলাইন (Same Unit) / বস্তুর দূরত্ব (Same Unit)]

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে এবং তা হল এক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের একই রাখতে হবে।

চলো এবার কিছু অঙ্ক করা যাকঃ

প্রশ্ন ১. যদি কোন একটি বস্তুর সর্বনিম্ন পরিমাপযোগ্য প্যারালাক্স কোন ১৫”(১৫ আর্কসেকেন্ড) হয় এবং আমরা বেসলাইন হিসেবে পৃথিবীর ব্যাস ব্যবহার করি তাহলে ঐ বস্তুর সর্বোচ্চ দূরত্ব কত হবে?

ছবি-৫

সমাধান:
বলে রাখা ভালো যে ১”(১ আর্কসেকেন্ড) বলতে বোঝায় ১° কোনের ৩৬০০ ভাগের এক ভাগ।
এখানে,

প্যারালাক্স কোন = ১৫”= ১৫” X (১°/৩৬০০”)= ৪.১৬৭ x ১০-৩ ডিগ্রি
বেসলাইন = ২ x পৃথিবীর ব্যাসার্ধ(R) = ২ x ৬,৩৭১ কিমি = ১২,৭৪২ কিমি

আমরা জানি,
প্যারালাক্স কোণ = ধ্রুবক x [বেসলাইন (Same Unit) / বস্তুর দূরত্ব (Same Unit)]
বা, প্যারালাক্স কোণ(ডিগ্রি) = ৫৭.৩° x বেসলাইন (কি.মি.) / বস্তুর দূরত্ব (কি.মি.)
বা, বস্তুর দূরত্ব(কি মি)= ৫৭.৩° x বেসলাইন (কি.মি.) / প্যারালাক্স কোণ (ডিগ্রি)
বা, বস্তুর দূরত্ব(কিমি)= ৫৭.৩° x ১২৭৪২ কি.মি / (৪.১৬৭ x ১০^-৩)°
বা, বস্তুর দূরত্ব = ১৭৫২১৩৯৬৬.৯ কি.মি.

≈ ১.১৭ AU (Astronomical Unit)

(জেনে রাখা ভালো যে ১AU = ১৪৯৫৯৭৮৭১ কি.মি.)

(ছবি-৫ অনুযায়ী) বস্তুটির সর্বোচ্চ দূরত্ব ১.১৭ AU

এখানে আমাদের নোট করা উচিত যে, আমরা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে স্থির স্টেলার ব্যাকগ্রাউন্ড কল্পনা করেছি।

এরকম আরো কিছু প্র্যাকটিস করা যেতে পারে।

প্রবলেম ১. ধরো, ভেনাস আমাদের থেকে ০.৫ AU দূরে অবস্থিত, বেসলাইন হিসেবে যদি আমরা পৃথিবীর ব্যাসকে ব্যবহার করি তাহলে প্যারালাক্স কোন কত হবে?

প্রবলেম ২. আমাদের থেকে ২ আলোকবর্ষ দূরের কোনো তারার প্যারালাক্স কোন ৩° কোণের ৭৫৪৩ ভাগের এক ভাগ, তাহলে ঐ তারার দূরত্ব নিখুঁত ভাবে মাপার জন্য পৃথিবীতে আমাদের কত ব্যাসার্ধের টেলিস্কোপ বানাতে হবে?

প্রবলেম ৩. আমাদের দুই চোখ দিয়ে ৩ আর্কসেকেন্ড এর সর্বোচ্চ কত দূরত্বের তারা দেখতে পাবো?

আমার মনে হয় এজাতীয় অঙ্কগুলো রিলেটিভলি অনেক সোজা! আমরা যখন এঙ্গুলার সাইজ, এঙ্গুলার রেজ্যুলিউশন আর স্টেলার প্যারালাক্স পুরোটাই (এর সীমাবদ্ধতা সহ) শিখে ফেলবো তখন অনেক মজার মজার প্রব্লেম সল্ভ করতে পারবো !! আশা করি ধারাবাহিকভাবে পরের নোট গুলোতে এই বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হবে। ভালো থেকো সবাই।

আবারো প্যারালাক্স (Parallax) নিয়ে কথা হবে এই নোটের ২য় পর্বে। সঙ্গেই থেকো তোমরা।