স্টেলার প্যারালাক্স ( Stellar Parallax) পর্ব – ২

ভেবে দেখ তো, কোন এক জ্যোৎস্না রাতে পড়ার টেবিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে চেয়ারে গাঁ এলিয়ে বসে আছ! টেবিলের পাশেই জানালা, চমৎকার চাঁদ, তারা !! বাহ্ খুবই মনোমুগ্ধকর, কিন্তু একটা সমস্যা। মানে ঠিক সমস্যা নয়, একটা মজার বিষয়। পড়ার টেবিলে স্থির হয়ে যে মোমবাতিটা জ্বলছে সেটা তো দেখি দূরের মিটিমিটি তারা গুলোর চেয়েও বড় দেখায়( ছবি-১)!! না নাহ্, আসলে তারা গুলোর সাথে তো বৈষম্য হলো। কোথায় সেই ‘আলদিবরণ’ আর কোথায় আমার মোমবাতি। কত-কত দূরত্ব! বৃষের(Taurus Constellation) সেই আলদিবরণ (Learn about Aldebaran) আর আমার এই মোমবাতি দুটকেই যদি একই জায়গায় পাশাপাশি রাখতাম তাহলে হয়ত ন্যায় বিচার হতো! https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://en.m.wikipedia.org/wiki/Aldebaran&ved=2ahUKEwin1oPrru_pAhXQyjgGHRjKArEQFjAUegQIBRAB&usg=AOvVaw19MDbWhYJ6KaHkHd6pvWjH

না, আমি আলদিবরন কে আমার টেবিলে আনার কথা ভাবছিনা, ভাবছি কোন বস্তু আসলেই বড় নাকি ছোট সেটা আমরা বিচার করি কিভাবে? দূরত্ব দিয়ে? হ্যাঁ, অবশ্যই দূরত্ব দিয়েই। কিন্তু আরেকটা বিষয় রয়েছে সেটা হল বস্তুটি আসলেই কতটা বড়। মানে তার ফিজিকাল সাইজ।

গত পর্বে আমরা প্যারালাক্স সম্পর্কে ইনট্রোডাকটরি ধারনা নিয়েছি, আজ আলোচনা করব এংগুলার সাইজ নিয়ে। কেন এংগুলার সাইজ? কারণ, প্রথমত স্টেলার প্যারালাক্স সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনার জন্য এংগুলার সাইজ সম্পর্কে জানা উচিত। দ্বিতীয়ত স্টেলার প্যারালাক্স এর অনেক প্রবলেম এ এংগুলার সাইজ বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়! এংগুলার সাইজ কনসেপ্ট টা অনেক সোজা কিন্তু না জানা থাকলে প্রবলেম সলভিং এ হোচট খেতে হবে!!

কৌণিক আকার (Angular Size):

ছবি-২

শুরুতেই আসা যাক এংগুলার সাইজ বিষয়টা আসলে কি? যদি সংজ্ঞায়ন করতে চাই তাহলে বলা যায় যে,
কোন বস্তুকে, একজন অবজারভার, একটি নির্দিষ্ট ভিউপয়েন্ট থেকে দেখলে বস্তুটির দুটি বিপরীত প্রান্ত অবজারভার এর ভিউপয়েন্ট এর সাথে যে কোন উৎপন্ন করে তাকেই এংগুলার সাইজ বলে( ছবি – ২)
আসলে এটা বাচ্চারাও বুঝে কোনো বস্তু দূরে যেতে থাকলে ছোট হতে থাকে আর যত কাছে আসে তত বড় হতে থাকে,
মানে একই বস্তু কাছে থাকলে এংগুলার সাইজ বড় হবে আর দূরে যেতে থাকলে এংগুলার সাইজ ছোট হতে থাকবে, ম্যাথম্যাটিকালি,

এংগুলার সাইজ ∝ ১/ দূরত্ব ———— (Eq1)

আবার, কোনো বস্তু ফিজিকালি যত বড় হবে তার এংগুলার সাইজ ততই বড় হবে। কিভাবে? ভেবে দেখুন একটি ফুটবল আর একটি টেনিস বল দুটোই আপনার হতে ৫০ মিটার দূরে অবস্থিত, আপনি কোনটাকে বড় দেখবেন? মজা করলাম আরকি, নিশ্চই ফুটবল তাইনা?
তাহলে,

এংগুলার সাইজ∝ফিজিকাল সাইজ ————- (Eq2)

এবার, ইকুয়েশন ১ ও ২ নং হতে পাই,

এংগুলার সাইজ∝ (ফিজিকাল সাইজ)/(দূরত্ব) বা, এংগুলার সাইজ = ধ্রুবকx(ফিজিক্যাল সাইজ)/(দূরত্ব) ————– (Eq3)

এখন কথা হল এই ধ্রুবক এর মান কত আর এর একক গুলোই বা কি?
খুবই সহজ, যদি আমরা “ফিজিক্যাল সাইজ” আর “দূরত্ব” একই এককে ব্যাবহার করি তাহলে এংগুলার সাইজ রেডিয়ান এককে আসবে, এবং ধ্রুবকের মান হবে ১। তবে আমরা রেশিও ম্যাথড ইউজ করলে একক নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে হবেনা।
এবার, ৩ নং ইকুয়েশন এ আমরা প্রোপোরশনাল চিহ্ন উঠিয়ে সমান চিহ্নের পর ধ্রুবকের মান ১ বসিয়ে পাই,

এংগুলার সাইজ (রেডিয়ান)= ( ফিজিক্যাল সাইজ)/(দূরত্ব) ————– (Eq4)

যদি আমরা আমাদের উত্তর ডিগ্রিতে নিয়ে আসতে চাই তাহলে প্রথমত যেটা আমরা করতে পারি তা হল, ইকুয়েশন ৪ ব্যাবহার করে আন্সার এনে সেটাকে ডিগ্রিতে কনভার্ট করতে পারি নতুবা আমরা ডিগ্রিতেই উত্তর আনার জন্য নতুন একটি ইকুয়েশন সহজেই বের করে ফেলতে পারি,

যেহেতু π রেডিয়ান এ ১৮০°, তাই আমাদের নতুন ইকুয়েশন,
এংগুলার সাইজ( ডিগ্রি) = (১৮০°/π রেডিয়ান) x( ফিজিক্যাল সাইজ)/(দূরত্ব)।
বা, এংগুলার সাইজ(ডিগ্রি) = ৫৭.৩° x( ফিজিক্যাল সাইজ)/(দূরত্ব) ———– (Eq5)

তবে এক্ষেত্রেও ফিজিক্যাল সাইজ আর দূরত্ব এর একক একই ব্যাবহার করতে হবে।

Note: এস্ট্রোফিজিক্সের ম্যাথ করতে গিয়ে হয়ত এংগুলার সাইজ আর প্যারালাক্স কোন এ ঝামেলা লেগে যেতে পারে, এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত প্যারালাক্স কোন মিজার করা হয় দুটি ভিন্ন অবজারভেশন পয়েন্ট থেকে কিন্তু এংগুলার সাইজ মিজার করা হয় একটি ভিউ পয়েন্ট থেকে।]

এবার একটা ইচ্ছাকৃত কম্পলিকেটেড ম্যাথ করব,

প্রবলেম ১:

ছবি-৩

মনে কর, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে পেরিজিতে চলে আসলো, আশ্চর্যজনক ভাবে একই সময়ে চাঁদ পৃথীবিকে ঘুরতে ঘুরতে এপোজিতে চলে আসে ( ছবি -৩ অনুসারে)। পৃথিবী ও চাঁদের নিজ নিজ কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা(eccentricity) যথাক্রমে ০.৩ ও ০.৫ এবং সেমি মেজর এক্সিস যথাক্রমে ১.৪৯৬x১০^১১মিটার ও ৩.৭৮x১০^৮ মিটার । নিশ্চই বুঝতে পারছ সূর্য গ্রহণ শুরু হয়ে গিয়েছে! তাহলে এখন প্রশ্ন হল, এটাকি পূর্ন সূর্যগ্রহণ নাকি আংশিক সূর্যগ্রহণ? যদি আংশিক হয় তবে সূর্যের কত অংশ ঢাকা পড়বে?

সমাধান:
শুরুতেই বলি, যদি তুমি উপবৃত্ত সম্পর্কে অজ্ঞাত হও, তাহলে জলদি গিয়ে উপবৃত্ত সম্পর্কে পড়ে ফেল। খুব একটা কঠিন বিষয় নয়। আর এস্ট্রোনমি পড়তে হলে উপবৃত্ত সম্পর্কে জানা একেবারে ফরয। এবার আমি আশা করি তুমি উপবৃত্ত সম্পর্কে ভালোই জানো।
তাহলে চল এবার এগুনো যাক,

বলে রাখা ভালো যে, পেরিজি হলো প্রধান ফোকাস থেকে সর্বনিম্ন দূরত্ব আর এপোজি হলো প্রধান ফোকাস থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব। এটা বাংলায় অনুসূর আর অপসূর নামেও পরিচিত। (ছবি -৪)

ছবি-৪

যাই হোক, এবার আমাদের ভাবা উচিত ম্যাথ টাতে কিভাবে আগানো যায়,

দেখ বলা হয়েছে, ওই সার্টেইন সময়ে পৃথিবী ছিল পেরিজিতে মানে সূর্য থেকে সর্বনিম্ন দূরত্বে আর চাঁদ ছিল এপোজিতে, মানে পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে। তাহলে আমরা পৃথিবীতে কোন ভিউপয়েন্ট থেকে যদি কোন ভাবে চাঁদ আর সূর্যের এংগুলার সাইজ বের করে ফেলতে পারি তাহলে তাদের অনুপাতই আমাদের নিয়ে যাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! (ছবি-৫)

ছবি-৫

চাঁদের ক্ষেত্রে,
চাঁদের নিজ কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা,e= ০.৫ এবং সেমি-মেজর এক্সিস,am= ৩.৭৮x১০^৮ m ।
[ Note that, এংগুলার সাইজ বের করতে হলে ফিজিক্যাল সাইজ জানা জরুরি। এক্ষেত্রে চাঁদের ফিজিক্যাল সাইজ হলো তার ব্যাস। কিন্তু প্রশ্নে আমি ইচ্ছে করেই তা প্রশ্নে উল্লেখ করিনি। কারন কোনো এস্ট্রোনমি জাতীয় কম্পিটিটিভ পরীক্ষাগুলোতে এটা দেওয়া থাকেনা( আমার পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলছি, পুরো কনসেপ্ট জেনেও সঠিক উত্তর আনতে পারিনি) মরাল অফ দ্যি স্টোরি ইজ, আমাদের এরকম কিছু ইউনিট মনে রাখতেই হবে, ঠিক যেমন আলোর গতি, মহাকর্ষীয় ত্বরণ ইত্যাদি ইত্যাদি!! ]
যেহেতু চাঁদের ব্যাসার্ধ,Rm= ১.৭৪x১০^৬ m
সুতরাং, চাদের ফিজিক্যাল সাইজ,D₁=(২x Rm)=(২x১.৭৪x১০^৬) m = ৩.৪৮x১০^৬ m
আবার চাঁদ এপোজি তে থাকায়, পৃথিবী থেকে চাদের দূরত্ব, d(max) = am x (১+e)
= ৩.৭৮x১০^৮ x (১ + ০.৫)
=৫.৬৭x১০^৮ m

সুতরাং, চাঁদের এংগুলার সাইজ, θ₁ = D₁/d(max)= ৩.৪৮x১০^৬ m/ ৫.৬৭x১০^৮ m= ৬.১৪×১০^-৩ rad
বা, θ₁= ৬.১৪×১০^-৩ rad

এখন, সূর্যের ক্ষেত্রে, (সূর্য তো আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরেনা তাই পৃথিবীর কক্ষপথ দিয়েই হিসেব করতে হবে)
তাই,
পৃথিবীর উৎকেন্দ্রিকতা, e= ০.৩ এবদে সেমি-মেজর এক্সিস,
aE=১.৪৯৬x১০^১১মিটার
অতএব, পেরিজিতে অর্থাৎ পৃথিবী হতে সূর্যের সর্বনিম্ন দূরত্ব, d(min)= a(E) × ( ১-০.৩)= ১.৪৯৬x১০^১১ × (১-০.৩) = ১.০৪৭×১০^১১ m
সূর্যের ফিজিক্যাল সাইজ, D₂= ২×(৬.৯৫৫×১০^৮) m = ১৩.৯১×১০^৮ m
সূর্যের এংগুলার সাইজ, θ₂ = D₂/d(min)
= ১৩.৯১×১০^৮ m/ ১.০৪৭×১০^১১ m
= ১২.৭৯৬×১০^-৩ rad
অতএব, θ₂= ১২.৭৯৬×১০^-৩ rad
এখানে, θ₂> θ₁
সুতরাং এক্ষেত্রে আংশিক সূর্যগ্রহণ হয়েছে(ছবি- ৬)
ছবি-৬
এবং আংশিক সূর্যগ্রহণ এর পরিমাণ = (θ₁/θ₂) ×100% = (৬.১৪×১০^-৩ rad/ ১২.৭৯৬×১০^-৩ rad) × 100% = ৪৭.৯৮%
অর্থাৎ, সূর্যের ৪৭.৯৮% ঢাকা পড়বে!!
অনেক মজার না?
প্রবলেম-১ ঠিক মত বুঝতে ও করতে পারলে এংগুলার সাইজ রিলেটেড অনেক ম্যথ ইজি হয়ে যাবে, তবে কম্বাইন্ড ম্যাথ এ একটু মাথা ঘামাতে হতে পারে! যাহোক আজ এতটুকুই।

পরের নোট এ এংগুলার রেজ্যুলিউশন নিয়ে কথা হবে, সবার সুস্থতা কামনা করি