সূর্যের চেয়ে ৫ বিলিয়ন গুণ উজ্জ্বল সুপারনোভার ছবি তুলেছে নাসা

তুমি আজ আছো তো কাল নেই। আমাদের অসীম মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত এই খেলা বিদ্যমান। বিশেষত নক্ষত্ররাজ্যে এই খেলাটি অত্যাধিক। কারণ আমাদের এই মহাবিশ্বে প্রত্যেক সেকেন্ডে একটি করে নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটছে। মহাকাশে যে নক্ষত্রের বিলীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্য সেটি তো আর হরহামেশা দেখা যায়না বরং এটি একটি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এমনকি জ্যোতির্বিদরা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে কিন্তু সেটি ক্যাপচার করে থাকেন। নক্ষত্র রাজ্যে প্রতিনিয়ত এই জন্মমৃত্যুর খেলা চিরকাল ধরে চলে আসছে। আর কোন একটি নক্ষত্রের জন্মলগ্ন থেকে পর্যায়ক্রমে মৃত্যু পর্যন্ত যে বিবর্তন ঘটে থাকে তাকে বলা হয় “নাক্ষত্রিক বিবর্তন (Stellar Evolution). এখন যারা আমরা জানি না এই নক্ষত্রদের মৃত্যুর বিষয়টি তাদের মনে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, “ওমা, নক্ষত্রদের আবার মৃত্যু আছে নাকি? তাদের কি প্রাণ আছে? কেমন করে হয় এই মৃত্যু বা কেনোই বা ঘটে।“ চলুন প্রথমে জেনে আসি নক্ষত্রের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু তথ্য।

চিত্রঃ “Messier 61 গ্যালাক্সিতে SN2020jfo সুপারনোভার দৃশ্য”

নক্ষত্রের পতন যেই কারণে ঘটেঃ

এখানে প্রথমেই একটি মজার তথ্য দিতে চাই আর সেটি হলো যতো বড় নক্ষত্র ততো কম তার আয়ুষ্কাল। যদিও অধিকাংশ বিশাল সব নক্ষত্র বেঁচে থাকে কয়েক বিলিয়ন বছর পর্যন্ত। একটি নক্ষত্র কতকাল বাঁচবে সেটি নির্ভর করবে সেই নক্ষত্রের মধ্যে কি পরিমাণে জ্বালানী রয়েছে তার উপর। বিশেষত হাইড্রোজেনের মোট পরিমাণের উপর। নক্ষত্রে হাইড্রোজেন এর পরিমান যত বেশি থাকে তার ভর তত বেশি হয়। তাহলে নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের তিনগুন হয় তাহলে কেন্দ্রের হাইড্রোজেন মাত্র দুইকোটি বছর এর মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। আর সেটা হয় শুধুমাত্র মহাকর্ষীয় শক্তির প্রভাবে। সূর্যের ভর যেহেতু কম সেহেতু সেটা নিঃশেষ হতে বেশি সময় লাগবে যা প্রায় এক হাজার কোটি বছর। আমাদের সূর্যের বয়স কিন্তু প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। যাইহোক যখন কোনো একটি নক্ষত্রের অভ্যন্তরীন কেন্দ্রে এই জ্বালানী ফুরিয়ে যায় তখন তার কেন্দ্রে জ্বালানীর সংকট দেখা দেয় আর এই জ্বালানীর সংকটের কারণে তখন সেই নক্ষত্রের কেন্দ্র নিজেই নিজের ভেতর ধসে পড়তে শুরু করে এবং আরো উত্তপ্ত হতে থাকে। এক সময় তা সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়। নক্ষত্রের মৃত্যুর আরেকটি কারণ হচ্ছে তাঁর ভর। আরেকটি মজাদার তথ্য দিতে চাচ্ছি সেটি হলো আমাদের সূর্যের কিন্তু সুপারনোভা হওয়ার মতো সেই পরিমাণের ভর নেই। এটি কিন্তু আমাদের ধরণীবাসীদের জন্য মোটেও কোনো সুখকর খবর নয় বরং এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। প্রশ্ন জাগছে কেনো এটি দুঃখের বিষয়? তাহলে চলো আরেকটু জেনে আসি।

সূর্য যখন একবার তাঁর সমস্ত নিউক্লিয়ার জ্বালানী শেষ করে ফেলবে তখন কিন্তু এটি “লাল দানবে (Red Giant)” এ পরিণত হতে কয়েক বিলিয়ন বছর সময় নিবে। ধীরে ধীরে আমাদের সূর্য মামা লাল দানবে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকবে আর আমাদের নীলাভ পৃথিবীকে বাষ্পায়িত করে ফেলবে। আর এই ঘটনাটি কিন্তু ঘটবে সূর্য ঠান্ডা হয়ে “শ্বেত বামন (White Dwarf)” পরিণত হওয়ার আগেই। কিন্তু কোনো নক্ষত্রের যদি সুপারনোভা হওয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণের ভর থাকে তবে সে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটাবে।

“SN 2018gv” সুপারনোভার বিস্ফোরণঃ

সম্প্রতি নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ একটি সুপারনোভার টাইম-ল্যাপ্স প্রকাশ করা হয়। এক বছর ধরে ধারণ করা সমস্ত চিত্রসমূহ একের পর এক জুড়ে দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে তা প্রকাশ করা হয়েছে ভিডিওটিতে। আমাদের এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের গতির ধারণা পেতেই সাত কোটি আলোকবর্ষ দূরের সে নক্ষত্রের ছবি ধারণ করা শুরু করে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। বিশেষ করে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলোর একে অপর থেকে কত দ্রুত সরে যাচ্ছে, তা অনুমান করতে সাহায্য করে যে কতোটা দ্রুত আমাদের এই মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি শখের জ্যোতির্বিদ কইচি ইতাগাকি প্রথম “SN 2018gv” সুপারনোভাটি শনাক্ত করেন। এরপর ফেব্রুয়ারী মাস থেকে সেটি ধারণ করা শুরু করে হাবল টেলিস্কোপ। টাইম-ল্যাপ্সের শুরুতে “NGC 2525” গ্যালাক্সির বাইরের দিকে আলোক ছটার মতো দেখায় সুপারনোভাটি। তবে খানিক পরই ছায়াপথের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে এই সুপারনোভাটি আমাদের সূর্যের চেয়েও ৫ বিলিয়ন গুণ উজ্জ্বল। ঠিক অনেকটা

চিত্রঃ “SN 2018gv” সুপারনোভা

পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের মতো। ক্ষণিকের জন্য যে পরিমাণ শক্তি নক্ষত্রটি থেকে ছড়িয়ে পড়ে, তা ৫০০ কোটি সূর্যের তেজস্ক্রিয়তার সমান। তাহলে বুজাই যাচ্ছে যে কতোটা ভংকর ব্যাপার স্যাপার। আর এই পরিমাণ শক্তি নির্গত হওয়ার পর তা যে খুব বেশি সময় দৃশ্যমান থাকবে না, তা তো জানা কথা। ভিডিওতেও তেমন দৃশ্যই দেখা যায়। ধীরে ধীরে আলো হারিয়ে ফেলে ক্ষীণ হতে থাকে সেই নক্ষত্র।

এই সুপারনোভাটি মূলত ঘটেছে “NGC 2525” নামক একটি “Barred Spiral Galaxy” টে। এখন এটি আবার কী জিনিস? আচ্ছা এটি নিয়ে আমাদের ওয়েবসাইটের নোত সেকশনে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করবো। এই গ্যালাক্সিটি আবার “Puppis Constellation” এ অবস্থিত।

NGC2525 - HST - Heic2018b.tif
চিত্রঃ “NGC 2525 গ্যালাক্সি”

ঠিক এভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের অন্ধকার মহাবিশ্বে ঘটছে জন্মমৃত্যুর খেলা। একদিকে যেমন একটি নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে আবার অন্যদিকে অন্য কোনো একটি নক্ষত্রের পতন ঘটছে। আর এই লীলাখেলায় প্রতিনিয়ত সংকোচন এবং বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটে চলছে নাক্ষত্রিক বিবর্তন। কখনো দেখা যাচ্ছে তীব্র অন্ধকার আবার কখনো দেখা যাচ্ছে বিস্ফোরিত আলোর আন্দোলন। আর এভাবেই অবিরাম ধারায় খেলা চলছে আমাদের এই অনন্ত মহাবিশ্ব আর তারই মাঝে আমরা নীলাভ একটি গ্রহতে বসবাস করে যাচ্ছি অসীম মহাবিশ্বের আরো চমকপ্রদ রহস্য উদঘাটনের আশায়।