শুন্য থেকে অসীমে

বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধ হয় এটিই যে বারবার সে নিজেকে নিজে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশ্নগুলি যেন সুতোর মত পেঁচিয়ে থাকে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৯১২ সালের তেমনি এক ঘটনা নতুন দুয়ার খুলে দেয় ভেস্তো স্লিফারের সামনে। ১৯২০ সালে আইনস্টাইনের রেডশিফট সমীকরণের উপর কাজের ফলাফলে জর্জ লেইমেট্রে এবং পরবর্তীতে হাবল, হিউমেসনের কাজের  ফসল হিসেবে আমরা বেশ কিছু ধারণা লাভ করি মহাজগতের সৃষ্টি নিয়ে। এই সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে জ্যোতির্বিদ্যার যে শাখা কাজ করে চলেছে তাকেই বলা হয় কসমোলোজি। শুধু যে সৃষ্টি নিয়েই কাজ করছে এমন কিন্তু নয়, মহাবিশ্ব কখন কোন রূপ নিবে, মহাবিশ্বের সেই গতি প্রকৃতি নিয়েও কাজ করে চলে এই শাখা।

মহাকাশ কিংবা সৌরজগৎ নিয়ে মানুষের কৌতূহল ছিল আদিমকাল থেকেই। তারা সবসময়-ই বুঝার চেষ্টা করত আকাশের এই সীমারেখার বাইরের জগৎ কে। তারা দেখতো কিছু নক্ষত্রের কিংবা কিছু তারার আনা-গোনার সাথে তাল মিলিয়ে কিভাবে প্রকৃতি নিজেকে পরিবর্তন করছে। দিন কখনো বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, কখনো ছোট। কিভাবে সে মহাজাগতিক বস্তুগুলি তাদের কে বলে দিচ্ছে কখন তাদের চাষাবাদ করতে হবে, কখন বীজ বপন। তারা নিজেদের জীবনকে সেসব মহাজাগতিক বস্তুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে দেখে একসময় ঐ বস্তুগুলিকেই দেবতা ভেবে পূজা করতে শুরু করে। তবু কৌতূহল থেকেই যায়! সেই কৌতূহল থেকেই মহাবিশ্বকে দেখার জন্য যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকে নানান প্রয়াস। 

অনেক ভ্রান্ত ধারণা, অজস্র ভ্রান্ত যুক্তিকে দীর্ঘকাল মনের মাঝে স্থান দেয়ার পর অবশেষে বিগ ব্যাং তত্ত্ব কে অধিক গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো বিগ ব্যাং নামকরণ টি করা হয় ১৯৪৯ সালে। ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল নামকরণ টি করেন। যদিও ১৯২৭ সালে জর্জ লেইমেট্রে এই তত্ত্ব প্রথমবারের মত উপস্থাপন করেন। জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে কাজ করার সবচেয়ে কঠিন দিকটি হচ্ছে আমরা প্রতিমুহূর্তে এমন সব নিত্যনতুন বিষয় জানতে থাকি যেগুলি কে কখনো কোন বৃত্তের ভেতরে এনে বিন্যাস করা যায় না। আমরা প্রতিবার নিজেদের মত করে কিছু অনুমানের ভিত্তিতে সে বৃত্ত কে সাজানোর চেষ্টা করি আবার প্রতিবারই চোখে পড়ে সেসব অনুমানের মাঝের ভুলভ্রান্তি। কখনো কখনো সমগ্র বৃত্তই ভুল প্রমাণিত হয় এবং সবকিছু নতুন করে ভাবা শুরু করতে হয়।

 বিগ ব্যাং তত্ত্বের মতে মহাবিশ্ব আজ থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং এক বিন্দু পরিমাণ স্থানে অবস্থান করছিল। সে বিন্দুর অস্তিত্বটা ছিল এতই ক্ষুদ্র যে সেটাকে অসীম ঘনত্বের বলে ধারণা করা হয়। যদিও বিগ ব্যাং নামকরণের পিছনে বিস্ফোরণের ধারণা কাজ করেছিল, তবে প্রকৃতপক্ষে এটা কোন বিস্ফোরণ ছিল না। বরং এটি এসেছে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সার্বজনীন তত্ত্ব থেকে। সে তত্তে বলা হয় মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়া শুরু করেছে অসীম ঘনত্বের সে বিন্দু সদৃশ শক্তি থেকে যাকে singularity নামে নামকরণ করা হয়। সময় এবং স্থানের মাঝে এই শক্তি বিরাজমান ছিল না। বরং এই শক্তির মাঝেই সুপ্ত ছিল সময় এবং স্থান। সেজন্য এই প্রসারণের পূর্বে কি হয়েছিল সে প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। যেখানে সময়ের অস্তিত্ব নেই, স্থানের অস্তিত্ব নেই সেখানে কোন কিছু আদৌ থাকা সম্ভব কিনা সেটাও এক প্রশ্ন! এ বিষয়ক আলবার্ট আইনস্টাইনের মত ছিল, প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে উত্তর মেরুরও উত্তর বলে আছে কিনা। অবশ্য এক্ষেত্রে আরেক ধরনের মতবাদও জানা যায় যে, হয়ত আমাদের এই মহাবিশ্বের পূর্বে অন্য এক মহাবিশ্বের অবস্থান ছিল যা প্রসারিত হতে হতে এক সময় ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়, যা পরবর্তীতে এক অবিশ্বাস্য রকম বৃহৎ কৃষ্ণগহবরে রূপ নেয়। সেই কৃষ্ণগহবর-ই পরবর্তীতে singularity তে পরিবর্তিত হয়।     

 পূর্বেই বলা হয়েছে, সময় এবং স্থান সুপ্ত ছিল বিন্দু সদৃশ শক্তির মাঝে। সেজন্য যখন মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে শুরু করে তা কোন স্থানকে ঘিরে প্রসারিত হতে থাকে না। বরং মহাবিশ্ব প্রসারিত হবার ভেতর দিয়েই স্থানের প্রসারণ হতে থাকে। যখন থেকে এই প্রসারণের শুরু, তখন থেকেই পদার্থ, স্থান, সময় এবং শক্তি সৃষ্টি হয়। তারপর মহাবিশ্বের বিবর্তনে দেখা যায় দুটি বড় এবং বেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। যার মাঝে একটি পর্যায়ে থাকে বিকিরণ এবং অপর পর্যায়ে পদার্থ। প্রথমটির স্থায়িত্তকাল যেখানে কয়েক হাজার বছর সেখানে দ্বিতীয়টির স্থায়িত্বকাল কয়েক বিলিয়ন বছর।   

বিকিরণ পর্যায়ঃ

প্ল্যাঙ্ক কালে কোন পদার্থের অস্তিত্ব ছিল না, ছিল শুধু শক্তির মৌলিক চারটি উৎসের এক আদিম অবস্থা। এই কালের শেষ দিকে সে অবস্থা ভেদ করে মহাকর্ষ শক্তি নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। তারপর আসে গ্র্যান্ড ইউনিফিকেসন কাল। এই কালের সমাপ্তি হয় যখন শক্তিশালী নিউক্লিয়ার শক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব পায়। তারপর ইনফ্লেসনারি কালে মহাবিশ্ব ক্রমাগতভাবে প্রসারিত হয়। এসময় মহাবিশ্ব আকারে বড় হয় এবং ইলেকট্রন, কোয়ার্ক ও অন্যান্য কণার উত্থান ঘটে। তারপর ইলেক্ট্রোউইক কালে শেষ দুটি শক্তি, তাড়িতচৌম্বক শক্তি এবং দুর্বল নিউক্লিও শক্তির নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। কোয়ার্ক কালে সব ধরনের কণার অবস্থান দেখা যায়। পরবর্তীতে হেড্রন কালে মহাবিশ্বের উত্তপ্ত অবস্থা ঠাণ্ডা হয় এবং কোয়ার্ক কণা থেকে নিউট্রন এবং প্রোটন কণার সৃষ্টি হয়। তারও পরে লেপটন কাল এবং নিউক্লিয়ার কালে প্রোটন আর নিউট্রন মিলে নিউক্লিয়াই তৈরি করে যা থেকে এক পর্যায়ে তৈরি হয় মহাবিশ্বের প্রথম হিলিয়াম কণা।  

  পদার্থ পর্যায়ঃ

এটোমিক কালে তাপমাত্রা আরও শীতল হলে প্রথম কোন পরমাণু তে ইলেকট্রন প্রবেশ করে এবং আমরা দ্বিতীয় মৌল হিসেবে হাইড্রোজেন কে পাই। গ্যালাক্টিক কালে হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম মিলে মেঘের মত পদার্থের সৃষ্টি করে যার ভেতরে এক ধরনের গ্যাস ঐ পদার্থকে ঘনীভূত করে। এর ভিতর দিয়েই আমরা বর্তমান সময়ের মহাবিশ্বে প্রবেশ করতে থাকি। এক পর্যায়ে তারা এবং নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যকার তাপ হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম থেকে স্টেলার কালে তৈরি করতে থাকে নতুন নতুন মৌল। ক্রমান্বয়ে সেই মৌলগুলোই ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে আমাদের গ্রহগুলির। এক সময় সৃষ্টি হয় আমাদের পৃথিবী, সেখানে দেখা দেয় প্রাণ। ধীরে ধীরে আমরা পদার্পণ করি আজকের সময়ে।  

Tags: