লাল গ্রহের আকাশে সবুজের আভা

মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত লাল গ্রহ মঙ্গলের আকাশে সবুজ রঙের আভা দেখা গিয়েছে। পৃথিবীর বাইরে কোন গ্রহে এই ধরনের আভা সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) ExoMars ট্রেস গ্যাস অরবিটার (Trace Gas Orbiter), সংক্ষেপে টিজিও। ২০১৬ সালে যখন Trace Gas Orbiter মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করছিলো তখন মঙ্গলের বায়ুমন্ডলের চারপাশে এই সবুজ রঙের আভা প্রথমবারের মত সনাক্ত করা হয়।

পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে এরূপ রঙের দেখা মিলে, যা অরোরা বা মেরুপ্রভা নামে পরিচিত। সৌর ঝড় থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন কণা ও মহাকাশ থেকে আগত বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ইলেকট্রন আমাদের বায়ুমন্ডলের উপরিভাগে আঘাত করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে এই রকম সবুজ বা লাল-নীল রঙের আলোর উৎপত্তি হয়। যেকোনো গ্রহের বায়ুমন্ডলে লাল, নীল বা সবুজ রঙের আলোয় আলোকিত হওয়ার অন্যতম ও একমাত্র উপায় হলো অরোরা বা মেরুপ্রভা। যখন সূর্যের আলো বায়ুমন্ডলের মধ্যে পরমাণু এবং অণুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করে তখন পৃথিবী এবং মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল দিন-রাত উভয় সময়ই ক্রমাগত আলোকিত হয়। দিনের বেলায় সৃষ্ট আলো ও রাতে সৃষ্ট আলোর কারন বিভিন্ন। রাতের আলো তৈরি হয় যখন ভাঙা-বিচ্ছিন্ন অনুগুলো পুনরায় একত্রিত হয় অপরদিকে দিনের আলো উৎপন্ন হয় যখন সূর্যের আলো সরাসরি অণু এবং পরমানু (নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন) উত্তেজিত অবস্থার সৃষ্টি করে। দিনের আলোয় সৃষ্ট জ্যোতি রাতে সৃষ্ট জ্যোতির তুলনায় কিছুটা হালকা দৃশ্যমান হয়। অক্সিজেন পরমাণু থেকে আলোর একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য নির্গত হয় যা পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনও গ্রহের চারপাশে কখনও দেখা যায়নি।

ধারণা করা হয় মঙ্গলের বায়ুমন্ডলে এই সবুজ রঙের আভা গত ৪০ বছর যাবত বিরাজ করছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Université de Liège) Jean-Claude Gérard যিনি Nature Astronomy জার্নালের প্রধান লেখক, তিনি ও তার সহকর্মীরা  টিজিওর (Trace Gas Orbiter) একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ মোড ব্যবহার করে এই আলোক নির্গমনটি চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। তারা UV এবং Visible স্পেকট্রোমিটার (UVIS) ও অরবিটারের অত্যাধুনিক যন্ত্র NOMAD (Nadir and Occultation for Mars Discovery) সহ আরো বিভিন্ন কনফিগারেশনে এই বিষয়টিকে পুঙ্খানুপঙ্খভাবে পর্যবেক্ষন করেন। NOMAD হলো ইউরোপিয়ান ExoMars TGO অরবিটারের চারটি যন্ত্রের একটি। এই স্পেকট্রোমিটার মুলত তিনটি পৃথক চ্যানেল নিয়ে গঠিত:

১) Solar Occultation (SO)

২) Limb Nadir and Occultation (LNO) এবং

৩) Ultraviolet and Visible Spectrometer (UVIS)

প্রথম দুটি চ্যানেল ইনফ্রারেড বা অবলোহিত (২.২-৪.৩ μm) পরিসীমায় কাজ করে; তৃতীয় চ্যানেলটি (UVIS) অতিবেগুনী-দৃশ্যমান পরিসীমায় (০.২ থেকে ০.৬৫ μm) কাজ করে, যা Ozone, Sulphuric Acid পরিমাপ করতে এবং Aerosol নিয়ে বিস্তর গবেষণা করতে সক্ষম।

Credit: ESA- “Earth airglow observed from the International Space Station”

NOMAD এর প্রধান ইনভেস্টিগেটর ও বেলজিয়ামের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ স্পেস এরোনমি (Institut Royal d’Aéronomie Spatiale de Belgique)-এর সহকারী লেখক Ann Carine Vandaele বলেন, এর আগে চালানো পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ গুলোতে মঙ্গল গ্রহে কোন ধরনের সবুজ উজ্জ্বলতা দেখা যায় নি, তাই আমরা UVIS nadir channel কে মঙ্গলের ‘edge’ নির্দেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমরা International Space Station থেকে তোলা পৃথিবীর ছবিতে দেখতে পাচ্ছি। গত বছর অর্থাৎ, ২০১৯ এর ২৪শে এপ্রিল থেকে  ১ লা ডিসেম্বর পর্যন্ত Jean-Claude, Ann Carine ও তার সহযোগীরা Trace Gas Orbiter এর সাহায্যে NOMAD-UVIS ব্যবহার করে মঙ্গলের পৃষ্ঠ হতে ২০-৪০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত স্ক্যান করে। এসময় TGO প্রত্যেক অরবিটে ২ বার করে স্ক্যান সম্পন্ন করে। উক্ত স্ক্যান হতে পাওয়া সমস্ত তথ্য বিশ্লেষন করে দেখা যায় প্রত্যেকটি ডাটা সেটে সবুজ অক্সিজেন নির্গমনের বিষয়টি স্পষ্টত পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মঙ্গলের পৃষ্ঠ হতে প্রায় ৮০ কি.মি. উচ্চতায় এই সবুজ অক্সিজেন নির্গমনের ব্যাপারটি সব থেকে বেশি স্পষ্ট দেখা যায়। উক্ত নির্গমনের নমুনা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় অতঃপর তা বিভিন্ন অংশে ভাগ হয়ে কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন তৈরি করে আর ফলস্রুতিতে এই অক্সিজেন পরমানুগুলোই অতিবেগুনী রশ্মি ও দৃশ্যমান আলোক রশ্মিতে উজ্জ্বলতা প্রদর্শন করে। সেই সাথে এই দু’ধরণের নির্গমনকে তুলনা করলে দেখা যায় যে দৃশ্যমান নির্গমন অতিবেগুনীর চেয়ে প্রায় ১৬.৫ গুণ বেশি তীব্র।

এই পর্যবেক্ষণমূলক পরীক্ষার সাথে পূর্ববর্তী theoretical বা তাত্ত্বিক মডেলগুলির সাদৃশ্যতা থাকলেও পৃথিবীর চারপাশে যে ধরনের আলোকসজ্জা দেখা যায় তার সাথে মঙ্গলের চারপাশের আলোকসজ্জার পার্থক্য রয়েছে। যেখানে পৃথিবীর দৃশ্যমান নির্গমনটি অনেক দূর্বল সেখানে মঙ্গলেরটা তুলনামূলক কম দূর্বল।

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির TGO-এর  Project Scientist-Håkan Svedhem বলেন, এই প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর বাহিরেও অন্য কোনও গ্রহের চারপাশে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নির্গমন সনাক্ত করা গেছে এবং ExoMars Trace Gas Orbiter এর NOMAD যন্ত্রের UVIS চ্যানেলের পর্যবেক্ষণের সুবাদে এর মাধ্যমে প্রথম কোনো বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা (scientific publication) বের করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রজেক্টের ফলে NOMAD যন্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারণা মিলেছে, এর উচ্চ সংবেদনশীলতা ও উন্নত অপটিক্যাল কাজের গতিকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই নতুন আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদেরকে নতুন জ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। একটি গ্রহের বায়ুমন্ডল ও তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে, মেরুপ্রভা সম্পর্কে পরিচিত জ্ঞানের বাইরেও যে আরো চাঞ্চল্যকর অজানা তথ্য রয়েছে সেগুলোকে নতুন করে জানতে সহায়তা করেছে এই গবেষণাটি। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও সেখানকার সবুজ আলোর রহস্য উদঘাটনসহ, সূর্য থেকে আসা সৌর ঝড়ের মাধ্যমে বিভিন্ন অনু-পরমানু লাল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিক্রিয়া করে তা আবার দিনের বেলা কেমন বা রাতে কেমন প্রভাব ফেলে সেই সম্পর্কে একদমই নতুন সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে এই গবেষণার কল্যানে।

এমনকি অক্সিজেন পরমাণুগুলির বৈশিষ্ট্য বা আচরণ সম্পর্কেও আমাদের আরও অনেক কিছু জানার আছে আর সেসব জানতে পারলে পরমাণু এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের আরো প্রসার ঘটাবে।


আর এই ধরনের গবেষণা গুলি অত্যধিক গুরুত্ব বহন করে কারন মানব জাতির চলমান ও ভবিষ্যতের অনেক মহাকাশ অভিযান লাল গ্রহ মঙ্গলকে কেন্দ্র করেই চলছে বা আগামীতেও চালানো হবে।  চাঁদের পর আমাদের মূল আকর্ষনটাই মঙ্গল গ্রহকে ঘিরে। আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা NASA বা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) কিংবা বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর মধ্যে এলন মাস্কের SpaceX বা জেফ বেজোসের Blue Origin ইত্যাদি সব সরকারী ও বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিশাল একটা জায়গা জুড়ে রয়েছে মঙ্গলে মানব বসতি গড়ে তোলা। আর সে লক্ষ্য কে সামনে রেখে মঙ্গল গ্রহে ধাপে ধাপে বিভিন্ন মিশনের মাধ্যমে গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষন চালানো হচ্ছে।

Credit: ESA- “ExoMars Rover 2022”

ExoMars TGO প্রজেক্টের কল্যানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে যে নতুন সব তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের অন্যান্য মঙ্গল অভিযানগুলো পরিচালনা করতে আরো সহায়তা করবে।

সব কিছু ঠিক থাকলে TGO প্রজেক্টের সফলতাকে মাথায় রেখে ESA আবার ২০২২ সালে ExoMars মিশন পরিচালনা করবে এবং এই মিশনে তারা একটি রোভার ও সার্ফেস সাইন্স প্লাটফর্ম পাঠাবে যার সাহায্যে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের পর এবার পৃষ্ঠভাগের আরো সব অজানা রহস্য ভেদ করা সম্ভব হবে বলে আশাকরা যায়!