মহাবিশ্বে নিঃসঙ্গ ভাসমান গ্রহ

নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্ব মানে হলো একা চলাচল করা। মাঝে মাঝে আমাদের সবারই নিঃসঙ্গতার প্রয়োজন হয় কিন্তু আমরা বেশি দিন একা থাকতে পারিনা আমাদের কারো না কারো দরকার হয়। এই বিশাল মহাবিশ্বেও একা থাকা কিছু বস্ত দেখা যায় যারা এই অনন্ত শূন্যে একাই ভেসে বেড়ায়।এই বস্তুগুলোর মধ্যে একটা বস্তু  হলো ভাসমান গ্রহ। মানুষ নিঃসঙ্গ থাকতে পারে না কিন্তু এই গ্রহ গুলো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর একা নিঃসঙ্গ থাকে। এই সকল গ্রহগুলো কোনো তারাকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে না।তাই এদের বলে ভাসমান গ্রহ বা তারাবিহীন গ্রহ বা আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্রহ আর ইংরেজিতে বলে “ROGUE PLANET.”

ভাসমান গ্রহ বা Rogue  planet এটা মহাবিশ্বের একটা বিস্ময়। ধারনা করা হয় আমাদের আকাশ গঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে ৫০ বিলিয়ন rogue planet বা ভাসমান গ্রহ আছে। এখন কিছু প্রশ্ন আপনা থেকেই এসে যায় যে এই ভাসমান গ্রহ জিনিসটা কি বা এরা আসলোই বা কোথা থেকে?? ভাসমান গ্রহ মানে হলো যে সকল গ্রহ কোনো তারাকে কেন্দ্র করে ঘোরে না।  এখন পর্যন্ত  Rogue planet বা ভাসমান গ্রহ সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত যত rogue planet পাওয়া গেছে তাদের সবার ভর বৃহস্পতি গ্রহের ভরের চেয়ে বেশি৷এথেকে ধারনা করা হয় এই গ্রহগুলো বেশির ভাগই নিভে যাওয়া “বামন নক্ষত্র (Brown Dwarf)।” আমরা সবাই জানি, নীহারিকা থেকেই তারার জন্ম হয় কিন্তু তারা জন্মের সময় এমন কিছু নক্ষত্রের উদ্ভব হয় যারা তাদের কম ভরের কারণে নিজের ভেতর নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম হয় না। তারাই পরবর্তীতে এই rogue planet বা ভসমান গ্রহে পরিণত হয়। কিন্তু সম্প্রতিককালে পৃথিবীর ভরের সমান গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এরা কোনো নিভে যাওয়া নক্ষত্র নয় এদের আচরণ পাথুরে গ্রহের মতো গ্যাসীয় গ্রহের মতো নয়। ধারণা করা হয় কোনো তারাকে কেন্দ্রকরে ঘুরতে ঘুরতে এরা তারার মহাকর্ষ থেকে ছুটে গেছে আর ছুটে অনন্ত মহাকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। এমনই একটি গ্রহ হলো PSO – J318.5-22, এই গ্রহটি পৃথিবী থেকে ৮০ আলোকবর্ষ দূরে এবং বৃহস্পতি থেকে ৬ গুণ ভারী।

এটি কোনো বামন নক্ষত্র নয় এটি একটি গ্রহ।এই সকল গ্রহ গুলোকে ধরার জন্য  বর্তমানে অনেক গবেষণা হচ্ছে।  যেমন একটি প্রকল্প হলো OGLE ( Optical Gravitational Lensing Experiment) এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত অনেক গ্রহ ধরা পরেছে যেমন: OGLE -2012-BLG-1323, OGLE-2017-BLG-0560. তাছাড়া NASA এই ভাসমান গ্রহগুলোকে আরো ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য  Nancy Grace Roman Space Telescope মহাকাশে পাঠাবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো যে গ্রহ কোনো তারাকে কেন্দ্র করেই ঘোরে না তাকে ধরা সম্ভব কিভাবে? উত্তরটা একটু কঠিন। ধরা যাক একজন লোক অন্ধকারে একা হেঁটে যাচ্ছে এক্ষেত্রে আমরা তাকে সহজে দেখতে পাবো না। কিন্তু আমরা যদি নাইট ভিশন দিয়ে বা থার্মাল ক্যামেরা দিয়ে তাকাই তবে আমরা তাকে শনাক্ত করতে পারবো। ঠিক একই ভাবে যেহেতু এরা বেশিরভাগই নেভানো বামন তারা তাই এদের থেকে সমান্য তাপ নির্গত হয়। এই তাপের নির্গমন থেকেই এদের শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এদের থেকে নির্গত তাপের পরিমান খুব কম তাই মাত্র ১০০০ AU (Astronomical Unit) এর মধ্যে থাকা গ্রহগুলোই এভাবে ধরা যায় আর তাছাড়া যদি সেটা পৃথিবীর ভরের গ্রহ হয় তবে তা থেকে তাপও নির্গত হয় না। তাই এই সকল rogue planet ধরার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো গ্রাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং (gravitational microlensing)পদ্ধতি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই গ্রভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিংটা কি? আমরা জানি কোনো বেশি ভরের বস্তু কম ভরের বস্তুকে আকর্ষণ করে আর ভর যদি অনেক বেশি হয় তবে তা আলোকেও আকর্ষণ করে। কোনো নক্ষত্রের সামনে যদি কোনো ভারী বস্তু চলে আসে তবে সামনের ভারী বস্তুর কারণে পেছনের নক্ষত্রের আলো বেঁকে যায় যার ফলে পেছনের নক্ষত্র কিছু সময়ের জন্য বেশি উজ্জ্বল দেখায়। এই পদ্ধতিটা অনেকটা মাইক্রোস্কোপের মতো। এই পদ্ধতিটাকেই বলে “গ্রাভিটেশনাল মাইক্রলেন্সিং (Gravitational Microlensing).”

এই পদ্ধতির সাহায্যে অতি সহজে এই গ্রহ গুলোকে ধরা যায়।এই গ্রহগুলোকে নিয়ে নানা ধারণা চলমান আছে যেমন অনেকে মনে করেন এই সকল rogue planet দের মধ্যে যেগুলো পৃথিবীর মতো তাতে প্রাণও থাকতে পারে। কারণ যদি এদের কেন্দ্র জ্বলন্ত থাকে তাহলে এটি অনন্ত অন্ধকারেও আণুবীক্ষণিক প্রাণ রাখার মতো শক্তি যোগাবে। আর তাছাড়া এ সকল গ্রহ হঠাৎ করেই অন্য সৌরজগতে ঢুকে পরে।  আর অন্য গ্রহের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়। তবে এটা নিশ্চিত এদের সম্পর্কে বিস্তর জানতে পারলে মহাবিশ্বের একটি অদেখা জগত সম্পর্কে আরো ধারণা পাওয়া যাবে। বোঝা যাবে অনন্ত এই অন্ধকার অদেখা মহাবিশ্বে আসলে কি আছে আর হয়তো প্রাণের রহস্যেরও সমাধান পাওয়া যাবে।