বস্তুর গতি ও টাইম ট্রাভেল 🕜🕑

আমরা হয়তো অনেকেই জানি যে কোনো একটি বস্তু স্পেস টাইমের মধ্যে আলোর বেগের যত কাছাকাছি বেগে চলতে পারবে, সেই বস্তুর সময় আপেক্ষিক ভাবে ততো ধীর হয়ে যাবে। অর্থাৎ, বস্তুটি ভবিষ্যতে যাত্রা শুরু করবে।আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে চলা বস্তুটিকে X এবং বাহিরের পর্যবেক্ষককে Y ধরলে দেখা যাবে X এর ১ সেকেন্ড সময় পার হতে হতে Y এর ৩ সেকেন্ড সময় পার হয়ে যাবে। এর মানে হলো যদি বস্তুটি একটি রকেট হয় আর রকেটটির ভিতরে যদি আমি থাকি তাহলে আমার সময় রকেটের বাইরে থাকা পর্যবেক্ষকের তুলনায় ধীরে চলবেঃ আমার যমজ ভাইকে রেখে যদি রকেটে ১ বছর সময় পার করি, এসে দেখবো আমার যমজ ভাই আমার থেকে বয়সে বড় হয়ে গেছে। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত, তাই না? অবশ্যই। কিন্তু এই অদ্ভুত বিষয়টার ভিতরই লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম লোমহর্ষক ত্বত্ত্ব, “Theory of Relativity”। কখনও কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন যে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলতে থাকলে কেনোই বা সময় ধীর হয়ে যাবে? এর প্রয়োজনীয়তাটাই বা কি? তবে এবার চলুন আলোর গতিকে চেতনার গভীর থেকে অনুভব করে আসি।

ধরা যাক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একই দিকে দুইটি বাস গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে। একটি হানিফ অন্যটি শ্যামলী। হানিফের গতিবেগ স্পিডোমিটারে দেখাচ্ছে ৮০ কিঃমিঃ/ঘন্টা। আর, শ্যামলীর গতিবেগ স্পিডোমিটারে দেখাচ্ছে ১১০ কিঃমিঃ/ ঘন্টা। এই দুটি বাসকে রাস্তার একপাশে দাড়িয়ে এলিসা কার্সন নামের একটি সুন্দরী মেয়ে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এক্ষেত্রে এলিসা হানিফের গতিবেগ ৮০ কিঃমি/ঘন্টাই দেখবে যা স্পিডোমিটারে দেখাচ্ছে ; শ্যামলীর ক্ষেত্রেও দেখবে ১১০ কিঃমিঃ/ঘন্টা। এবার চিন্তা করে দেখুন যে হানিফের বাস ড্রাইভার রাকিব শ্যমলী বাসটির গতিবেগ কত দেখবে? ১১০? কখনই না। রাকিব দেখবে শ্যামলীর গতিবেগ (১১০-৮০)= ৩০ কিঃমিঃ/ ঘন্টা। কারণ, বাস দুটি একই দিকে গতিশীল। তার মানে গতি পরম নয়; আপেক্ষিক। একজনের সাপেক্ষে গতি একেকরকম হতে পারে। এই ঘটনাটি মহাবিশ্বের সব বস্তুর ক্ষেত্রেই সত্যি। কিন্তু, ঝামেলাটি তৈরী করেছে আলো। কীভাবে? শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

আলোর গতিবেগ সেকেন্ডে ৩০০০০০ কিঃমি। এবার হানিফ বাসের সাথে শ্যামলীকে তুলনা না করে আলোকে নিয়ে আসি। ধরলাম, হানিফের গতিবেগ সেকেন্ডে ১২০ কিঃমিঃ। তাহলে হানিফের বাস ড্রাইভার রাকিবের সাপেক্ষে আলোর গতিবেগ হওয়ার কথা সেকেন্ডে (৩০০০০০-১২০)= ২৯৯৮৮০ কিঃমিঃ। কিন্তু, আলোর গতিতো পরম। যে কোনো রেফারেন্স ফ্রেমে আলোর গতি একই থাকবে। অর্থাৎ, হানিফ যদি সেকেন্ডে ২৯৯৯৯৯ কিঃমিঃ বেগেও চলে, তবুও রাকিব দেখবে আলোর গতি সেই সেকেন্ডে ৩০০০০০ কিঃমিঃ। এটা কি করে সম্ভব? বিষ্ময়কর মনে হলেও এটাই সত্যি। এবার দুই মিনিট সবকিছু বাদ দিয়ে নিজে চিন্তা করুন যে এই পরিস্থিতিতে কীভাবে আলোর গতি সেকেন্ডে ৩০০০০০ থাকা সম্ভব (থাকার কথা ২৯৯৮৮০ কিঃমিঃ/সেকেন্ড)। এটা তথনই সম্ভব যখন হানিফের বাস ড্রাইভার রাকিবের সময় ধীর হয়ে যাবে। অর্থাৎ, রাস্তার পাশে দাড়ানো এলিসার ২ সেকেন্ড সময়কে রাকিব ১ সেকেন্ড (আনুমানিক) ধরে অনুভব করবে। বুঝতে সমস্যা হলে আবার চিন্তা করুন। একবার বুঝতে পারলে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন এক স্বাদ পাবেন।

এই যে, একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের সময় ধীর হয়ে যাওয়ার যে ঘটনা, রিলেটিভিটিতে একে টাইম ডায়ালেশন বলে। এবার আরেকটু মজা করা যাক। কি হবে যদি হানিফের বেগ আলোর গতির সমান হয়ে যায়? তাহলে হানিফের বাস ড্রাইভার রাকিবের সময় থেমে যাবে। কারণ, কোনো আলো তার নিকট পৌছাতে পারবে না।তবে, রিলেটিভিটি অনুযায়ী স্পেস টাইমের ভিতর কোনো বস্তুর আলোর বেগে চলা সম্ভব নয়। কারণ, আলোর বেগে চললে বস্তুটির মোমেন্টাম অসীম হয়ে যায় আর মোমেন্টাম অসীম হলে তাকে গতিশীল রাখতে প্রয়োজন অসীম পরিমাণ শক্তি; যা অসম্ভব। যাই হোক, এটি আবার অন্য আরেকটি মজার বিষয়। পরে কোনো একদিন আলোচনা করা হবে। এবার কথা হলো এই যে টাইম ডায়ালেশন নিয়ে যে এত কথা বললাম এটার প্রমাণ কি? প্রমাণ অবশ্যই আছে। প্রমাণ না থাকলে তো আর আমরা মহা বিজ্ঞানী আইন্সটাইনকে নিয়ে এত মাতামাতি করতাম না। টাইম ডায়ালেশনের একটি অন্যতম প্রমাণ হলো জি.পি.এস। রিলেটিভিটির সূত্র ছাড়া জি.পি.এস সঠিক ভাবে কাজ করতে পারতো না।