পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের ছায়াপথ

চিত্রঃ এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি

আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ের বেশ কিছু মহাকার্ষিক প্রতিবেশী আছে। এর মাঝে সবচেয়ে কাছে হলো এন্ড্রোমিডা, প্রায় ২,৪৮,০০০ আলোকবর্ষ দূরে। এমনকি আকাশ পরিষ্কার থাকলে পৃথিবী থেকে খালি চোখেও আমরা এন্ড্রোমিডার দেখা পেতে পারি। এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে আমাদের মিল্কিওয়ের চেয়ে অনেক বেশি নক্ষত্র আছে আর এ কারণেই এ গ্যালাক্সি দেখতে খুবই উজ্জ্বল ও মনোমুগ্ধকর। আসলে এর সম্মোহনী সৌন্দর্যের কারণেই এর নাম এন্ড্রোমিডা রাখা হয়েছিল।

তাহলে, প্রথমেই এন্ড্রোমিডার নামের পিছনের গল্পটা জানা যাক। 

এন্ড্রোমিডার ইতিহাস

গ্রিক দেবতা হারকিউলিসের নাম হয়ত আমরা অনেকেই শুনেছি। সেই হারকিউলিস ছিলেন এন্ড্রোমিডার বংশধর। যাই হোক, এন্ড্রোমিডার গল্পে আসা যাক। এন্ডোমিডা ছিলেন ইথিওপিয়ার রাজা Cepheus ও রাণী Cassiopeiaর কন্যা। রাণী তাঁর মেয়ে এন্ড্রোমিডার সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করে বলতেন যে এন্ড্রোমিডা জলদেবীদের চেয়েও বেশি সুন্দর। এ গর্বে ক্ষুব্ধ হয়ে জলদেবতা Poseidon তাঁর এক জলদানবকে পাঠায় পুরো ইথিওপিয়ার উপর প্রতিশোধ নিতে। সে সময় পুরো রাজ্যকে বাঁচাতে রাজা বাধ্য হন নিজের মেয়েকে বিসর্জন দিতে। এ সময় এন্ড্রোমিডাকে সমুদ্রতীরে বেঁধে রাখা হয় জলদানবের কাছে উৎসর্গ হিসেবে। কিন্তু পথে যাবার সময় এন্ড্রোমিডার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আরেক দেবতা Perseus তাঁকে রক্ষা করে। কথিত আছে, এন্ড্রোমিডার মৃত্যুর পর দেবী এথেনা তাঁকে ও তাঁর পুরো পরিবারকে উত্তর আকাশে স্থান দেন। আর একারনেই উত্তর আকাশ বা northern hemisphere এর সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সুন্দর নক্ষত্রমন্ডলীকে “এন্ড্রোমিডা নক্ষত্রমন্ডলী” (Andromeda Constellation) আর সেই নক্ষত্রমন্ডলীর ছায়াপথকে নাম দেয়া হয় “এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি”। এর উজ্জ্বলতার কারণেই মূলত একে এত দূর থেকেও খালি চোখে দেখা সম্ভব হয়, এমনকি, এন্ড্রোমিডা গালাক্সিই পৃথিবী থেকে খালি চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সি।

বর্তমানে অবশ্য এন্ড্রোমিডাকে অফিশিয়ালি Messier 31 (M31) বা NGC 224 নামে ডাকা হয়। তবে এখনো উত্তর আকাশের উজ্জ্বল এন্ড্রোমিডা মানুষকে মুগ্ধ করে চলেছে ঠিক সেই গ্রিককন্যা এন্ড্রোমিডার মতই।

চিত্রঃ এন্ড্রোমিডা নক্ষত্রমন্ডলী

সর্বপ্রথম ৯৬৪ সালে আল-সুফি নামের একজন পার্সিয়ান জ্যোতির্বিদ এন্ড্রোমিডার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। তবে তিনি একে ছায়াপথ হিসেবে শনাক্ত করতে পারেন নি, little cloud হিসেবে অভিহিত করেন। ঠিক ৯০০ বছর পরে Simon Marius এন্ড্রোমিডাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, এন্ড্রোমিডা মূলত স্পাইরাল আকারের গ্যালাক্সি, কোনো নিছক মেঘ কিংবা তারা নয়।

চিত্রঃ ১৮৯৯ সালে Isaac Roberts এর তোলা এন্ড্রোমিডার প্রথম ছবি

এন্ড্রোমিডার বর্তমান হাল-চালঃ

২০১৩ সালে বিজ্ঞানীরা এন্ড্রোমিডাতে বামন নক্ষত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পান, যা মিল্কিওয়েতেও রয়েছে।

এরপরে ২০১৫ সালে হাবল টেলিস্কোপে দেখা যায়, এন্ড্রোমিডাকে ঘিরে এক ধরনের পদার্থ আছে যা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, এমনকি পূর্বের দশকের পরিমাপের পর আরো ৬ গুণ বেশি বড় হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের ছবিতে আরো দেখা গেছে, এ গ্যালাক্সিতে পূর্বের অনুমানের তুলনায় ১০০ মিলিয়নেরও বেশি নক্ষত্র রয়েছে।

চিত্রঃ ESA’s Herschel space telescope ও XMM-Newton’s X-ray telescope থেকে প্রাপ্ত এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ছবি

২০১৬ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা এ গ্যালাক্সিতে ৬৬টি ব্ল্যাকহোল খুঁজে পান। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এ ব্ল্যাকহোলগুলো খুঁজে পেতে সেই বিজ্ঞানীদল ১৩ বছর ধরে ১৫৩টি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।   

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে এসে বিজ্ঞানীরা এন্ড্রোমিডাতে ডার্ক ম্যাটার ও পালসারের (মৃত নক্ষত্র) অস্তিত্ব খুঁজে পান।

চিত্রঃ XMM-Newton’s X-ray telescope থেকে প্রাপ্ত এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ছবি

এন্ড্রোমিডা ও এলিয়েনঃ

অনেক জ্যোতির্বিদই পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির বেশ কিছু গ্রহতে প্রাণের অস্তিত্ব বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আছে। সুতরাং, এন্ড্রোমিডায় এলিয়েন অস্তিত্বের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায়না। এমনকি, অনেকে এক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেন, হয়তো মানবজাতি কয়েকশো বছরের মধ্যে এন্ডোমিডার এলিয়েনদের দ্বারা শাসিতও হবে! তবে সে সম্ভাবনা বিতর্কিত হলেও, এটা নিয়ে কোনোই সন্দেহ নেই যে একদিন আমাদের হোম-গ্যালাক্সিঃ মিল্কিওয়ে, প্রতিবেশী গ্যালাক্সি-এন্ড্রোমিডার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। এ সংঘর্ষ শুরু হবে আরো প্রায় দুই বিলিয়ন বছর পরে আর সংঘর্ষের পরে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে আরো দুই বিলিয়ন বছর লেগে যাবে। এরপরে হয়তোবা মিল্কিওয়ে ও এন্ড্রোমিডা নামে আলাদা কোনো গ্যালাক্সির অস্তিত্বই থাকবে না, দু’টো গ্যালাক্সি এক হয়ে একটা বিশাল বড় গ্যালাক্সি- ‘মিল্কোমেডা’তে পরিণত হবে। সেখানে আমাদের এখনের সূর্য দানবাকৃতির লাল নক্ষত্রে (Red Giant) পরিণত হবে আর পৃথিবীসহ ছোট-বড় সব গ্রহগুলো বিলীন হয়ে নক্ষত্রকণা বা স্টার-ডাস্টে পরিণত হবে। আবার সেই স্টারডাস্ট থেকে নতুন করে গ্রহ-উপগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং হাজার হাজার বছর পর সেই গ্রহ-উপগ্রহে প্রাণের উদ্ভব হবে; ঠিক যেমনটা হয়েছিল বিগ-ব্যাং এর পরে।

চিত্রঃ ট্রিলিয়ন বছর পরে মিল্কোমেডার কাল্পনিক ছবি

এন্ড্রোমিডার উদ্ভব রহস্য

মিল্কিওয়েবাসী হিসেবে আমাদের কাছে গ্যালাক্সি-গ্যালাক্সি সংঘর্ষের ব্যাপারটা নতুন হলেও এন্ড্রোমিডা কিন্তু ইতিমধ্যেই একবার তার প্রতিবেশী গ্যালাক্সি M32 এর সাথে এমন সংঘর্ষ করে ফেলেছে। টেলিস্কোপে এন্ড্রোমিডার বাইরের অংশ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন সিদ্ধান্তে এসেছেন। কারণ সংঘর্ষের সময় স্বভাবতই খুবই জোরালো বল (Tridal Force) কাজ করেছিল, আর এ সুযোগে বড় গ্যালাক্সি ছোট গ্যালাক্সিকে গ্রাস করে ফেলে; পুরোটা গ্রাস না করলেও অন্তত ছোট গ্যালাক্সির বাইরের অংশ, যেমনঃ নক্ষত্রবাষ্প, মেঘ, অর্থাৎ মিলিতভাবে Globular Cluster কে গ্রাস করে ফেলে। এক্ষেত্রে এন্ড্রোমিডা বা M31 তার প্রতিবেশী ছোট গ্যালাক্সি M32-এর সাথে সংঘর্ষ করে একে গ্রাস করে বর্তমানের বিশাল গ্যালাক্সিতে পরিণত হয়েছে।

গ্রহ-নক্ষত্রেরও এভাবে সৃষ্টি ও ধ্বংসের সমারোহ দেখে, জীবনানন্দ দাশের কবিতার কিছু লাইন মনে পড়া স্বাভাবিক,

পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,

নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি?