দ্য ডপলার ইফেক্ট

মনে কর তুমি রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছ। এমন সময় একটি অ্যাম্বুল্যান্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে দ্রুত বেগে এসে সিগন্যালে থামল। সিগন্যাল ছেড়ে দেওয়ার পর অ্যাম্বুল্যান্সটি সাইরেন বাজাতে বাজাতে চলে গেল। এইক্ষেত্রে তুমি যেসকল ঘটনা অনুভব করবে তা হল যখন অ্যাম্বুল্যান্সটি সাইরেন বাজাতে বাজাতে তোমারদিকেএগিয়েআসছিলতখন যেন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অ্যাম্বুল্যান্সটি যখন সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল তখন সাইরেনের শব্দের কোন পরিবর্তন হয় নি। আর অ্যাম্বুল্যান্সটি যখন চলে যাচ্ছিল তখন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতা যেন কমে যাচ্ছিল। ঠিক একই ঘটনা ট্রেন কিংবা ফায়ারট্রাকের ক্ষেত্রেও ঘটে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা আমাদের চারপাশে এই ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে আসছি। ১৮৪২ সালে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ডপলার এই ঘটনাটির যথাযথভাবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা দেন। তারই নামানুসারে এই ঘটনাটিকে বলা হয় “ডপলার ইফেক্ট” বাংলায় “ডপলার ক্রিয়া”

ডপলার ইফেক্ট যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এটা নিয়ে বিস্তারিত পড়াশুনা করলেই জানা যায়। বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোনমিতে এর গুরুত্ব তো বলেই শেষ করা যাবে না। কোনো তারা আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে বা আমাদের দিকে আসছে , দূরবর্তী কোনো তারার ভর বা বেগ নির্ণয়,দূরবর্তী কোনো গ্যালাক্সীতে বাইনারি তারার অবস্থান নির্ণয় কি নেই যেখানে এই ডপলার ইফেক্ট কাজে লাগে না। এই নোটে আমরা এই সকল কিছু নিয়ে বিস্তারিত জানব-আমরা ডপলার শিফট নিয়ে পড়ব, ডপলার ইফেক্ট এর সমীকরণ দেখব, কিছু মজার ম্যাথ সল্ভ করব, অ্যাস্ট্রোনমিতে ডপলার ইফেক্টের ব্যবহার দেখব, অর্থাৎ ডপলার ইফেক্ট নিয়ে আদ্যোপান্ত আমরা জানার চেষ্টা করব। প্রথমেই ডপলার ইফেক্টের সংজ্ঞাটা দিয়ে নিই।

ডপলার ইফেক্ট (Doppler Effect) কী?

উৎস এবং পর্যবেক্ষকের মধ্যকার আপেক্ষিক গতির কারণে কোন তরঙ্গের কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ডপলার ইফেক্ট বলে।

সংজ্ঞাটা একটু কঠিন লাগছে তাই না? চল এটা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করে দেখি, তখন দেখবে এটা একদম পানির মত সোজা ।

এই বিষয়টা ভালো করে বুঝার জন্য চল প্রথমে যে ঘটনাটি বলেছিলাম যখন অ্যাম্বুল্যান্সটি সাইরেন বাজাতে বাজাতে যতএগিয়েআসছিল সেখানে সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেই ঘটনাটি আবার ভেবে দেখি-

যখন আমাদের শব্দের উৎস(এক্ষেত্রে অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেন)পর্যবেক্ষকের (এক্ষেত্রে তুমি) দিকে এগিয়ে আসছে তখন প্রতিটি ধারাবাহিক শব্দ তরঙ্গ চূড়া তাদের নিজ নিজ আগের অবস্থান থেকে পর্যবেক্ষকের দিকে একধাপ এগিয়ে আসছে। যার ফলে প্রতিটিশব্দতরঙ্গ পর্যবেক্ষকেরনিকটপৌঁছাতেআগের তরঙ্গের চেয়ে সামান্য কম সময় নেয়। যার ফলে দুটি ধারাবাহিক তরঙ্গ চূড়ার পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছানোর সময়ের পার্থক্য কমে যায়। একই সাথে দুটি ধারাবাহিক তরঙ্গমুখের মধ্যকার দূরত্বও কমে যায় যার ফলে তরঙ্গ গুলো যেন একসাথে গুচ্ছাকারে থাকে এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায়। আমরা জানি তরঙ্গদৈর্ঘ্য আর কম্পাঙ্ক একে অপরের ব্যস্তানুপাতিক। তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাওয়ায় কম্পাঙ্ক বেড়ে যায়। আর কম্পাঙ্ক বেড়ে যাওয়া মানেই শব্দের তীক্ষ্ণতা বেড়ে যাওয়া। আর ঠিক এজন্যই অ্যাম্বুল্যান্স যত এগিয়ে আসতে থাকে সাইরেনের তীক্ষ্ণতা তত বৃদ্ধি পেতে থাকে  (চিত্র-১)

চিত্র-(১)

আর অ্যাম্বুল্যান্সটি যখন দাঁড়িয়ে ছিল তখন সাইরেনের শব্দে কোন পরিবর্তন হয়নি। তার মানে উৎস আর পর্যবেক্ষকের মধ্যে যদি আপেক্ষিক গতি না থাকে তাহলে শব্দের কম্পাঙ্কে কোন পরিবর্তন হবে না। (চিত্র-২)

(চিত্র-২)

বিপরীতক্রমে অ্যাম্বুল্যান্স যখন পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে তখন প্রতিটি ধারাবাহিক শব্দ তরঙ্গ চূড়া তাদের নিজ নিজ আগের অবস্থান থেকে পর্যবেক্ষকের দিকে একধাপ পিছনে চলে যাচ্ছে। যার ফলে প্রতিটি শব্দ তরঙ্গ পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছাতে আগের তরঙ্গের চেয়ে সামান্য বেশি সময় নেয়। যার ফলে দুটি ধারাবাহিক তরঙ্গ চূড়ার পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছানোর সময়ের পার্থক্য বেড়ে যায়। একই সাথে দুটি ধারাবাহিক তরঙ্গ মুখের মধ্যকার দূরত্বও বেড়ে যায় যার ফলে তরঙ্গ গুলো যেন ছড়িয়ে থাকে এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ায় কম্পাঙ্ক কমে যায়। কম্পাঙ্ক কমে যাওয়ায় শব্দের তীক্ষ্ণতা কমে যায়। এজন্যই অ্যাম্বুল্যান্স যত দূরে যেতে থাকে সাইরেনের তীক্ষ্ণতা তত কমতে থাকে। (চিত্র-৩)

(চিত্র-৩)

ডপলার ইফেক্ট যে শুধু শব্দ তরঙ্গের জন্যই হয় এমনটা নয় এটি আলোক তরঙ্গের জন্যও হয়ে থাকে।আর আলোক তরঙ্গের ডপলার ইফেক্ট নিয়েই আমাদের পরের টপিক ডপলারশিফট।

ডপলার শিফট(Doppler Shift):

অ্যাস্ট্রোনমিতে ডপলার ইফেক্টের সবচেয়ে বড় ব্যবহার বুঝি এই ডপলার শিফট দিয়েই করা হয়। ডপলার শিফট কী তা এখন আমরা বিস্তারিত জানব।

কোন খ-গোলকীয় বস্তুর(celestial object) বর্ণালি ঐ বস্তুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। উক্ত বস্তু কোন নক্ষত্র হতে পারে যে তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে আলো নিঃসরণ করছে। কোন গতিশীল আলোক উৎসের বর্ণালিরেখারপরিবর্তনউক্ত উৎসেরবেগেরউপরনির্ভরকরে। ধরা যাক পৃথিবী থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে একটি তারা রয়েছে। এখন এই তারাটি যদি পৃথিবী থেকে দূরে যেতে থাকে তাহলে উক্ত তারার বর্ণালিতে বর্ণালিরেখাগুলো বর্ণালিটির লাল প্রান্তের দিকে অগ্রসর হয়।যাকে বলা হয় ডপলার রেডশিফট (Doppler Blue Shift)। আর তারাটি যদি পৃথিবীর দিকে আসতে থাকে তাহলে বর্ণালি রেখাগুলো বর্ণালিটির নীল প্রান্তের দিকে অগ্রসর হয়। যাকে বলে ডপলার ব্লুশিফট (Doppler Blue shift) (চিত্র)।

(চিত্র-৪)

কেন এমন হয় তার কারণটি এখন বলছি

কোনো তারার পৃথিবী থেকে দূরে যাওয়ার সাথে অ্যাম্বুল্যান্সের চলে যাওয়ার ঘটনাটি ভেবে দেখ দেখি, অ্যাম্বুল্যান্স যখন চলে যাচ্ছিল তখন শব্দতরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঠিক তেমনি যখন কোনো তারা পৃথিবী থেকে দূরে চলে যেতে থাকে তার আলোক তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় যার ফলে তারার বর্ণালিতে বর্ণালি রেখাগুলো বর্ণালির লাল প্রান্তের দিকে যায়( কারণ লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য নীল রঙের চেয়ে বেশি)। আর এটাই হল ডপলার রেড শিফট। আর ঠিক একইভাবে কোনো তারা যখন পৃথিবীর দিকে আসতে থাকে তখন আলোক তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায় ঠিক অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে আসার সময়ে শব্দতরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাওয়ার মত।তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাওয়ার কারণে তারার বর্ণালিতে বর্ণালি রেখাগুলো বর্ণালির নীল প্রান্তের দিকে যায়।আর এটাই হল ডপলার ব্লুশিফট। আর এভাবে ডপলার শিফট থেকে আমরা বলতে পারি কোনো তারা আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে না আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এমনকি এর মাধ্যমে আমরা দূরবর্তী গতিশীল কোনো তারার বেগও নির্ণয় করতে পারি। কীভাবে করতে পারবে তার জন্য তোমাদের পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কারণ পরের পর্বে আমরা ডপলার ইফেক্টের সমীকরণ আর ম্যাথ নিয়ে কথা বলব। সে পর্যন্ত আমাদের সাথেই থেকো তোমরা।

বিদায়। সবাই ভালো থেকো।