জ্যোতির্বিদ্যার মোদ্দাকথা – ৩

This image has an empty alt attribute; its file name is iastoppers-International-Astronomical-Union-IAU.png

এটি একটি জরুরি ধারণাগত বিবরণ। [জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যারা আগ্রহী, যাঁরা কাজ করেন, পড়াশোনা করেন, বুঝতে চান, শিখতে চান – তাঁদের ধারণা স্পষ্ট করার জন্য এটা একটা দরকারি ডকুমেন্ট। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা এই ডকুমেন্টটি তৈরি করেছে জ্যোতির্বিদ্যায় সাক্ষরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। বিজ্ঞান সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে যেমন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন কয়েকটি ধারণাগত স্টেটমেন্ট তৈরি করেছে, এটিও তদ্রূপ। এখানে ১১টি মূল পয়েন্ট আছে। প্রতিটির অধীনে আছে ৫-৭টি উপধারা এবং তাদের বিস্তারিত বিবরণ। এগারোটি ধারায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের কয়েকটি মূল স্তম্ভকে সংক্ষেপে তুলে আনা হয়েছে। এই বিষয়গুলি সম্পর্কে এবং এদের উপধারায় বর্ণিত প্রস্তাবনাগুলি সম্পর্কে আমাদের সাধারণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই বর্ণনাগুলিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাক্ষরতার সাথে বিজড়িত কোর কনসেপ্ট। অতএব, এই আন্তর্জাতিক ইশতেহারটি অনুধাবন ও অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। – সম্পাদক ]

জ্যোতির্বিদ্যার মোদ্দাকথা # 3
আইএইউ ডকুমেন্ট , ২০২০
ধারা ১

১. জ্যোতির্বিদ্যা মানব-ইতিহাসের প্রাচীনতম বিজ্ঞানগুলোর অন্যতম

১.১ আকাশ এবং সূর্য ও গ্রহসমূহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ছিল ভৌতজগত অনুধাবনের প্রথম প্রচেষ্টা।

জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের অঙ্কন (ড্রইং) এবং বস্ত্রশিল্প থেকে। আকাশে তারা যা দেখেছে তার প্রতিফলন সেগুলিতে পাওয়া যায়। প্রাচীন সমাজে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়াদি ছিল বিভিন্ন পুরাণ (মিথ) বা ধর্মীয় ও আচারিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ব্যাবহার করে সময় গণনা এবং পঞ্জিকা তৈরি করা হতো,যা প্রাচীন সমাজে দৈনিক ও ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠানাদি পরিকল্পনায় সহায়ক ছিল।

১.২ প্রাচীন সমাজে রাতের আকাশের বিবিধ নক্ষত্রকে নিয়ে কাল্পনিক নকশা প্রচলিত ছিল।

রাতের আকাশের তারাগুলোকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে সংযুক্ত করে যে নকশা কল্পনা করা হতো তাদেরকে তারামণ্ডলী বা কনস্টেলেশন বলে। বহু প্রাচীন সংস্কৃতির মানুষেরা আদিতম তারামণ্ডলীর কল্পনা করে গেছে। এইভাবে শনাক্তকৃত তারাদের দলকে বিভিন্ন সমাজের মানুষের [যেমন গ্রিক, মায়া, নেটিভ আমেরিকান ও চৈনিক সভ্যতার] লৌকিক কাহিনি এবং পৌরাণিক গল্পের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে রাতের আকাশের সুচিহ্নিত অঞ্চলসমূহ তারামণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত, যাদের মধ্যে রয়েছে প্রাচীনতম পরিচিত তারামণ্ডলী এবং আরো আছে পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে চিহ্নিত তারামণ্ডলী। দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীদের মতো কোনো কোনো প্রাচীন সংস্কৃতিতে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের উজ্জ্বল ব্যান্ডের ভেতরকার অন্ধকার কালো অঞ্চলকে নিয়েও নকশা কল্পিত আছে।

১.৩ দুনিয়াজোড়া নানা সভ্যতার আর্ট ও কালচারে উদ্দীপনা জুগিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পরিবর্তে শিল্প সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়াদি ব্যবহৃত হয়েছে।

বহু শতাব্দী ধরে লেখক, কবি, শিল্পী এবং সৃজনশীল ও চিন্তাবিদ মানুষেরা তাঁদের সৃষ্টিতে রাতের আকাশকে হয় ব্যবহার করেছেন অথবা এর দ্বারা অণুপ্রাণিত হয়েছেন। বিভিন্ন শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য, সঙ্গীত এবং সাহিত্যে আমরা মহাকাশ বিষয়ক থিম দেখতে পাই। এইসব সৃজনশীল কর্মে রাতের নানা দৃষ্টিগ্রাহ্য মোটিফকে ব্যবহার করে রাতের আকাশের রোমাঞ্চ, সৌন্দর্য, রহস্য, মর্ম প্রকাশ করা হয়েছে প্রত্যক্ষ ভাবে বা পরোক্ষে। আর্টের বিশ্বজনীনতা এবং মানুষের অন্তর্গত সংস্কৃতির সাথে এর অন্তর্লীন সম্পর্কের কারণে এটা মানুষের উপর একটা শক্তিশালী ও গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে মানুষ যে শুধু জ্যোতিষ্কদের সৌন্দর্য আর মহাজাগতিক প্রপঞ্চের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করে তা নয়, বরঞ্চ ঐ বিষয়ক লব্ধজ্ঞানও তাঁকে বিস্মিত করে। এটা বিশ্বব্যাপী জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে মানুষকে আগ্রহী করে তোলে এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ও ত্বরান্বিত করে, কেননা এই বোধ খুব শক্তিশালী যে– আমাদের একটাই আকাশ।

১.৪ জ্যোতির্বিজ্ঞান সময় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গণনায় সাহায্য করে, যা প্রাচীন কৃষির জন্য অপরিহার্য ছিল।

অনেক প্রাচীন সভ্যতায় কৃষি-পঞ্জিকার শুদ্ধতা আনতে গিয়ে জ্যোতির্বিদ্যার প্রচলন ও বিকাশ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, আকাশের লুব্ধক নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণকে ভিত্তি করে প্রাচীন মিশরে পঞ্জিকা চালু ছিল, কেননা ঐ পর্যবেক্ষণ থেকে তারা নীলনদে বার্ষিক বন্যার আগাম পূর্বাভাস দিত।

১.৫ অতীতে জ্যোতির্বিজ্ঞান দিক-নির্দেশনার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অনেক সভ্যতাতেই নক্ষত্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্ক ব্যবহার করে স্থল, জল এবং মহাসমুদ্রে গতিপথ নির্ধারণ করা হতো। মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ থেকে দিকনির্দেশনা আজো পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত।

১.৬ জ্যোতির্বিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে যা জোতিষশাস্ত্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।

প্রাক-আধুনিক কাল পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের পার্থক্য বেশ অস্পষ্ট ছিল। আজকাল এই পার্থক্য একদমই নেই, এই দুটোই সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়বস্তু। জ্যোতির্বিজ্ঞান একটি বিকশিত বিজ্ঞান, এবং জ্যোতিষশাস্ত্র কোনো বিজ্ঞানই নয়। জ্যোতিষ্কদের অবস্থান বিবেচনা করে জ্যোতিষশাস্ত্রে ভবিষ্যৎ ঘটনা [এবং ব্যাক্তিবিশেষের আগাম ভবিষ্যৎ] সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। তবে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়সমূহ এবং এর পূর্বাভাসগুলি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে এই পূর্বাভাসগুলো সঠিক নয় এবং জ্যোতিষের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

১.৭ কোনো কোনো প্রাচীন সভ্যতায় পৃথিবী্কে বিশ্বের কেন্দ্র বলে বিশ্বাস করা হত।

অধিকাংশ প্রাচীন সমাজের অধিবাসীরা, ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আশেপাশে জীবিত গুটিকয়েক গ্রিক জ্যোতির্বিদ ছাড়া, সবাই বিশ্বাস করত যে পৃথিবীই জগতের কেন্দ্রে অবস্থান করে। ষোড়শ শতাব্দীর কোপার্নিকান বিপ্লবের আগ পর্যন্ত দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় জুড়ে ইউরোপ ও এশিয়ার সমাজে এই ভুকেন্দ্রিক মতবাদই প্রতিষ্ঠিত ছিল। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট কেন্দ্র বলে কিছু খুঁজে পাননি।

১.৮ একশো বছরের প্রচেষ্টায় কোপার্নিকান বিপ্লব সৌরজগতের কেন্দ্রে পৃথিবীর বদলে সূর্যকে প্রতিস্থাপন করেছে।

ষোড়শ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস তাঁর সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ প্রকাশ করলেন। এই মত অনুযায়ী জগতের কেন্দ্রে সূর্য অবস্থিত এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। এখন অবশ্য আমরা জানি যে, সূর্য সমস্ত জগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয় বরঞ্চ শুধু সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত। তবে ঐ সময়ে কোপার্নিকান সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ বৈপ্লবিক তত্ত্ব ছিল এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের গোড়াপত্তনে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।

১.৯ প্রায় চারশত বছর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য

নিজে টেলিস্কোপ আবিষ্কার না করলেও গ্যালিলিওই সর্বপ্রথম এটা দিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু করেন। তিনি প্রতিসারক দুরবিনের উন্নতি সাধন করলেন এবং ফলে তিনি শুক্রগ্রহের দশা পরিবর্তন এবং বৃহস্পতি গ্রহের চারটি বৃহত্তম উপগ্রহ খুঁজে পেয়েছিলেন। এই চারটিকে আজও গ্যালিলিয়ান চাঁদ বলে। তাঁর এইসব আবিষ্কারের ফলে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদের সপক্ষে জোরালো সাক্ষ্যপ্রমাণ মেলে।

১.১০ পৃথিবী নামক গ্রহটির আকৃতি প্রায় বর্তুল আকৃতির এবং বহু শতাব্দী ধরে তা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত ছিল।

অনেক প্রাচীন সমাজ ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীকে সমতল বা চাকতির মতো ভেবে নিয়ে তাদের বিশ্ববীক্ষা দাঁড় করিয়েছে। পৃথিবীকে গোলক হিসেবে ভাবনাও কয়েক হাজার বছরের পুরনো এবং অন্য অনেক সভ্যতা ও সমাজের বিশ্ববীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রচলিত ছিল। প্রায় ১০০০ বছর আগে এই ধারণাই প্রভাবশালী প্যারাডাইম হিসেবে গৃহীত হয়। পৃথিবী যে প্রায় গোলাকাকৃতির (বৈজ্ঞানিক ভাষায় অবলেট স্ফেরয়েড, পেটমোটা কমলালেবু) সেটা পরীক্ষা করে দেখার অনেকগুলো এমপিরিক্যাল উপায় আছে। এরাটোস্থেনিস একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন যা প্রাচীনতম গাণিতিক পদ্ধতিগুলির অন্যতম। তিনি প্রাচীন মিশরের দুটি স্থানে পরিমাপিত লাঠির ছায়ার দৈর্ঘ্য বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী)।

অনুবাদ ও সম্পাদনা টিমের পক্ষে – Dr. Farseem Mannan Mohammedy

National Outreach Coordinator (Bangladesh), International Astronomical Union (IAU)