“গাড়ির চাকা গ্যালাক্সি (Cartwheel Galaxy)”

সেই সুদূর বিগব্যাং থেকে নানা রকমের চাঞ্চল্যকর রহস্যেঘেরা আমাদের এই মহাবিশ্ব। কখনো দেখা যায় রহস্যের খেলা, কখনো দেখা যায় সৌন্দর্যের খেলা। রহস্য এবং সৌন্দর্য  দিয়ে পরিবেষ্টিত আমাদের এই অসীম  মহাবিশ্ব। আমরা কমবেশি সবাই একটি সাধারণ তথ্য জানি আর তাহলো আমরা যেই গ্যালাক্সিতে বাস করি তার নাম হলো “Milkyway Galaxy.” কিন্তু এই বিশাল মহাবিশ্ব কি শুধুমাত্র এই একটিমাত্র গ্যালাক্সিতেই আবদ্ধ? উত্তরটি হবে কখনোই না। Hubble Telescope এর মতে আমাদের এই মহাবিশ্বে ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি রয়েছে। তবে বিজ্ঞানের উন্নতি এবং টেলিস্কোপের উন্নতির সাথে সাথে এর সংখ্যা হয়তো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা রকমের রহস্যময় গ্যালাক্সি। এই গ্যালাক্সিগুলো দেখতে কোনোটি সর্পিল আকৃতির, কোনোটি আবার আংটির মতো, কোনোটি আবার উদ্ভট রকমের দেখতে। এমনই একটি উদ্ভট গ্যালাক্সির ব্যাপারে আজ আমরা জানতে চলেছি। নিশ্চয়ই আর্টিকেলটির টাইটেলে থাকা নামটি দেখে এতোক্ষণে আপনারা অনুমানও করে ফেলেছেন যে কতটা উদ্ভট গ্যালাক্সি এটি, তাইনা? তাহলে চলুন এবার জেনে আসা যাক এই গ্যালাক্সিটির সম্বন্ধে। জেনে আসি এই গ্যালাক্সির ব্যাপারে কিছু অজানা, রহস্যজনক এবং চাঞ্চল্যকর তথ্য যা আপনারা কখনোই আগে শোনেন নি।

চিত্রঃ “Cartwheel Galaxy”

Cartwheel Galaxy” :

আপনারা আর্টিকেলটির টাইটেলে যে বিদ্ঘুটে নাম দেখতে পাচ্ছেন আসলে এই গ্যালাক্সির সুন্দর নাম হলো এই “Cartwheel Galaxy” যার বাংলা অর্থ হলো “গাড়ির চাকা গ্যালাক্সি।“  এই গ্যালাক্সিটির আরো তিনটি নাম হলোঃ  “ESO 350-40, PGC 2248, MGC-06-02-022a.” এটি আমাদের মহাবিশ্বের অদ্ভুত সব গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি একটি Lenticular Galaxy এবং Ring Galaxy। Lenticular Galaxy এর ব্যাখ্যা অন্য একটি আর্টিকেলে আপনাদেরকে জানানো হবে। এই গ্যালাক্সিটি ৫০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে Sculptor Constellation এ অবস্থিত। ধারণা করা হয় যে এই গ্যালাক্সির ব্যাস ১৫০০০০ আলোকবর্ষ এবং ভর 2.9–4.8 × 109 সৌরভর। এই গ্যালাক্সিটির ঘূর্ণনগতি হলো 217 km/s. এই গ্যালাক্সিটি ১৯৪১ সালে Fritz Zwicky আবিষ্কার করেন। Zwicky তাঁর আবিষ্কার সম্পর্কে বলেন,

“আমার এই আবিষ্কারটি হলো সবচেয়ে জটিল কাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম যার ব্যাখ্যা হবে basis of stellar dynamics বা তারকীয় গতিবিদ্যার ভিত্তিতে যেটি ব্যাখ্যায়িত হওয়ার জন্য অপেক্ষমান অবস্থায় রয়েছে। “

এই গ্যালাক্সির ধারণাকৃত ব্যাসার্ধ আমাদের Milkyway Galaxy এর চেয়ে বিশাল।

চিত্রঃ “দুটি গ্যালাক্সির মধ্যকার সংঘর্ষ”

ছোট্ট আরেকটি গ্যালাক্সির সাথে সংঘর্ষের পূর্বে ২০০ মিলিয়ন বছর আগে এই গ্যালাক্সিটি একটি সাধারণ সর্পিল আকারের গ্যালাক্সি বা Spiral Galaxy. যখন এই Cartwheel Galaxy এর পার্শ্ববর্তী গ্যালাক্সি এই গ্যালাক্সির ভেতর দিয়ে যায় তখন এই গ্যালাক্সি দুটির সংঘর্ষের ফলে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয় এবং একটি শক্তিশালী Shock wave এর সৃষ্টি হয়। এই Shock wave টি প্রচুর গতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ার সময় আশেপাশের সমস্ত গ্যাস এবং ধুলোকে উড়িয়ে দিয়ে চলে যায় এবং যার ফলে গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে একটি Starburst এর সৃষ্টি হয় এবং যা অক্ষতই থাকে। আর এই কারণেই একটি নীল রঙের ( Bluish ) রিং বা আংটির মতো সৃষ্টি হয় যা উপরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছি যে এই Cartwheel Galaxy এর এমন অদ্ভুত আকার আগে ছিলো না। এই আকারটি হয় তাঁর পার্শ্ববর্তী ছোট্ট গ্যালাক্সিটির সাথে সংঘর্ষের পর থেকে যা চিত্রের বামদিকে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি Starburst এই গ্যালাক্সিটির চারপাশের কিনারাকে জাগ্রত বা আলোকিত করে দিয়েছে এবং এই চারপাশের কিনারার ব্যাসার্ধ আমাদের Milkyway Galaxy এর চেয়ে বিশাল যা আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। এই Starburst বা Star Formation এর ফলাফল হিসেবে পাওয়া যায় বড় এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রের গঠন। যখন একটি বিশাল আকৃতির নক্ষত্র “Supernovae” হিসেবে বিস্ফোরিত হয় তখন তার অবশিষ্ট হিসেবে থেকে যায় Neutron Stars এবং Blackholes. এই Neutron Stars এবং Black holes এর আবার কিছু কিছু পার্শ্ববর্তী Companion Stars থাকে এবং তারা খুব শক্তিশালী  X-ray রশ্মির উৎস হয়ে যায়। আপনাদের মনে এতক্ষণে প্রশ্ন জেগে গেছে যে এই Companion Stars টা আবার কী? আমরা আমাদের অন্য একটি পর্বে এই Companion Stars কে নিয়ে বিস্তারিত করবো। উপরের  X-ray ছবিতে যে সাদা ডটটি দেখা যাচ্ছে সেটি হলো সবচেয়ে উজ্জ্বল  X-ray এর উৎস অর্থাৎ সেটি ব্ল্যাখোল এবং তার পার্শ্ববর্তী Companion Stars. Cartwheel Galaxy তে এরকম বিশাল আকৃতির ব্ল্যাকহোল রয়েছে যা binary X-ray এর উৎস কারণ বিশাল আকৃতির অনেক নক্ষত্র এই গ্যালাক্সিটির রিঙ্গেই গঠিত হয়েছে।

এরকমই লক্ষ লক্ষ আশ্চর্যজনক এবং রহস্যময় বস্তু দিয়ে ঘেরা আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই অত্যন্ত রহস্যময়। হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আর বহু অজানা এবং রহস্যময় তথ্য আবিষ্কৃত হবে। হয়তো একদিন আবিষ্কৃত হবে যে ব্ল্যাকহোলের মধ্যে আসলেই কি অন্য কোনো মহাবিশ্ব বা dimension রয়েছে কিনা। হয়তো একদিন Wormhole এর আবিষ্কারের ফলে আমরা সহজেই এক মহাবিশ্ব থেকে আরেক মহাবিশ্বে অতি সহজেই পাড়ি জমাতে পারব। আর সেই দিনগুলোর প্রতীক্ষায় পুরো পৃথিবীবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।