অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার

বিভিন্ন সুপারহিরো মুভিতে আমরা অনেকেই হয়ত খেয়াল করেছি বেশ কয়েকজন সুপারহিরোই তাদের পাওয়ার পেয়েছিল ডার্ক ম্যাটার নামক এক বস্তুর সংস্পর্শে এসে। বিশেষ করে ইদানিং জনপ্রিয় ডিসি সুপারহিরো সিরিজ ফ্ল্যাশ কিংবা লিজেন্ডস অফ টুমরোতে দেখা যায়, পার্টিকল এক্সিলারেটর বিস্ফোরণের ফলে ডার্ক এনার্জির সংস্পর্শে এসে বেশ কিছু মানুষের নানা রকম সুপার পাওয়ার তৈরি হয়। তাহলে, চলুন জেনে নেয়া যাক ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি আসলে কি এবং আসলেই তা মানুষকে ‘মেটাহিউম্যান’ এ পরিণত করতে পারে কিনা।

ডার্ক ম্যাটার ডার্ক এনার্জিঃ

কয়েক দশক আগ পর্যন্তও আমরা জেনে এসেছি, পুরো মহাবিশ্বের যা কিছু বিদ্যমান সবই পরমাণু দিয়ে তৈরি যার আবার মূলে রয়েছে প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, মহাবিশ্বের সার্বিক ভরের মাত্র ৫% জুড়ে রয়েছে এই পরমানু দ্বারা গঠিত বস্তু, এখন মনে কৌতুহল জাগা স্বাভাবিক যে বাকি ৯৫% জুড়ে কি তবে শূণ্যতা বিরাজ করছে?

উত্তর হলো ‘না’।

আমাদের কাছে বাতাস যেমন এক অদৃশ্য বস্তু, কিন্তু তারপরও আমরা জানি বাতাসের অস্তিত্ব আছে; ঠিক তেমনি, মহাশূণ্যে গ্রহ-নক্ষত্রের বাইরে সবকিছু আপেক্ষিকভাবে অন্ধকার ও শূণ্য মনে হলেও আসলে এখানেও এক প্রকার বস্তু বিদ্যমান যার অস্তিত্ব না থাকলে আমাদের মহাবিশ্বের চিত্রটাই হয়তো বদলে যেত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এ বস্তু আমাদের কাছে দৃশ্যমান তো নয়ই, এমনকি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পরীক্ষাতেও এর কোনো অস্তিত্ব ধারণ করা যায় না, অর্থাৎ এর ওপর আলোর প্রভাব নেই। আর এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এ বস্তুর নাম দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার বা বাংলায় কৃষ্ণবস্তু।        

এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের মতামত অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটার শুধুমাত্র গ্রাভিটেশনাল বা মহাকর্ষীয় বলের প্রতিই সক্রিয়তা দেখিয়েছে। আলো কিংবা চার্জের প্রতি এর কোনোই প্রভাব নেই।

কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্বের Lambda-CDM মডেল অনুযায়ী, ইউনিভার্সের ভর-শক্তি সিস্টেমের মাত্র ৫% জুড়ে আমাদের পরিচিত স্বাভাবিক জিনিসের বিচরণ, অন্যদিকে, ২৭% জুড়ে ডার্ক ম্যাটার আর ৬৮% জুড়ে ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব রয়েছে।  

১৩.৬ বিলিয়ন বছর আগের ডার্ক ম্যাটার সৃষ্টির কাল্পনিক চিত্র
(Illustration Courtesy Volker Springel, Max Planck Institute for Astrophysics, Et A)

আমরা জানলাম, ডার্ক ম্যাটার আলো শোষণ, প্রতিফলন কিংবা বিকিরণ করে না। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডার্ক ম্যাটার এর অস্তিত্বের কথা তাহলে মানুষ জানলো কিভাবে? এর অস্তিত্ব আবিষ্কারের পেছনে অনেকগুলো ছোট্ট ঘটনা কাজ করেছে। ঘটনাগুলো সংক্ষেপে কিছুটা জানা যাক।

ক্রমবর্ধমান বিশ্বঃ

আমাদের এ বিশাল মহাবিশ্ব কিন্তু কোনো ধ্রুব বিশালতায় থেমে নেই, বরং প্রতিনিয়ত তা প্রসারিত হয়ে বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে। তবে পূর্বে বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, মহাকর্ষ বলের প্রভাবে হয়তো এ প্রসারণ এক সময় ধীর হয়ে যাবে বা থেমে যাবে। কিন্তু তারা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে আশ্চর্য হন, কারণ ধীর হওয়া তো দূরের ব্যাপার, বরং মহাবিশ্বের প্রসারণ হার দিনকে দিন আরো বেড়ে চলেছে, তার মানে, মহাবিশ্বে এমন কোনো বস্তু রয়েছে যা মহাকর্ষ বলকে বিকর্ষণ করছে, ফলে মহাবিশ্বের আয়তন প্রতি মুহূর্তে বেড়ে চলেছে।

এ ঘটনা থেকেই মূলত মহাবিশ্বে অদৃশ্য কোনো বস্তু বা বলের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রথম পর্যালোচনা করা হয়েছিল গত শতাব্দীতে। 

১৯৩০ সালে এক সুইশ জ্যোতির্বিদ Fritz Zwicky ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলোজিতে গবেষণা করাকালীন সময়ে, এ অদৃশ্য বস্তুর নাম দেন, “dunkel (kalt) materie,” এ জার্মান শব্দের অর্থ ডার্ক (ঠান্ডা) ম্যাটার।

ডার্ক ম্যাটার ম্যাপ | NASA

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকর্ষের বিপরীতে ক্রিয়ারত অদৃশ্য বল- ‘ডার্ক এনার্জি’ না থাকলে আমাদের মহাবিশ্ব হয়তো ধ্বংসই হয়ে যেত। ডার্ক এনার্জিকে অনেক বিজ্ঞানীই ৫নং মৌলিক বল হিসেবে আখ্যায়িত করেন যার অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য এখনো অজানা।       

অ্যানোম্যালিঃ

১৯৭০ সালের দিকে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী Vera Rubin এবং Kent Ford গ্যালাক্সিতে বেশ কিছু ব্যাপার পর্যবেক্ষণ করেন যা তৎকালীন পদার্থবিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না, এসব ঘটনাগুলোকেই তারা ‘অ্যানোম্যালি’ হিসেবে আখ্যা দেন আর এর মূলে ডার্ক ম্যাটারকে দায়ী করেন।

যেমনঃ অনেক দুরের গ্যালাক্সির কোনো নক্ষত্র থেকে আগত আলো পৃথিবীর টেলিস্কোপে অনেক distorted বা বিকৃতভাবে ধরা পড়ে। যদি মহাশূন্যে আসলেই পুরোপুরি শূন্যতা বা ভ্যাকিউম অবস্থা বিরাজ করতো, তাহলে কখনোই এ আলোকরশ্মির এভাবে বিকৃতি ঘটতো না। এ ঘটনা থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, মহাশূণ্যে অদৃশ্য মেঘের ন্যায় কোনো বস্তু আছে যা মহাকর্ষ বলকে বিকর্ষণ করতে পারে আর সে কারণেই এর মধ্য দিয়ে অনেক দূরের গ্যালাক্সির আলোকরশ্মি অতিক্রম হবার সময় কিছুটা দিকভ্রান্ত হয়ে পৃথিবীর টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। এ ঘটনাটিকে গ্রাভিটেশনাল লেন্স বলা হয়।

গ্রাভিটেশনাল লেন্স | NASA

এছাড়া ঘূর্নায়মান গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ডার্ক ম্যাটার হলো এক প্রকার ফ্লুইড জাতীয় ম্যাট্রিক্স যা পুরো মহাবিশ্বকে ধারণ করে আছে, যার অনুপস্থিতিতে মহাবিশ্বে গোলযোগ সৃষ্টি হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।       

ডার্ক ম্যাটারের উপাদানঃ

আমরা অনেকে হয়তো নিউট্রিনোর নাম শুনেছি। নিউট্রিনো এক প্রকার মৌলিক কণা যা মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনে অবদান রেখেছে। এটা অনেকটা আমাদের পরিচিত ইলেকট্রনের মত হলেও ইলেকট্রনের যেমন কিছুটা হলেও ভর থাকে, ঋণাত্মক আধান থাকে, নিউট্রিনোর সেসব কিছুই নেই। এটা প্রায় ভরশূণ্য ও সম্পূর্ণভাবে চার্জবিহীন এক কণা, যা কিনা আলোর সমবেগে চলতে পারে। ডার্ক ম্যাটারের অনেক বৈশিষ্ট্যের সাথেই এই নিউট্রিনোর মিল পাওয়া যায় বলে ডার্ক ম্যাটারের মূল উপাদান হিসেবে নিউট্রিনোর নামই বেশি আসে।


নিউট্রিনো

এছাড়া অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ১৩.৬ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের সময়ে সৃষ্ট প্রাচীন (primordial) ব্ল্যাকহোলগুলোই সময়ের পরিক্রমায় বিয়োজিত হয়ে ডার্ক ম্যাটার নামক প্রবাহীতে পরিণত হয়েছে। আর এই ব্ল্যাকহোলগুলোর আকার পরমানুর মত ছোট্ট থেকে শুরু করে সূর্যের চেয়ে ১০,০০০ হাজার গুণ বড়ও ছিল বলে অনুমান করা হয়। সুতরাং এত বিশাল আকারের ব্ল্যাকহোল গুলো যদি সত্যিই বিয়োজিত হয়ে ফ্লুইড জাতীয় ডার্ক ম্যাটারে পরিণত হয়ে থাকে তবে এটা খুবই স্বাভাবিক যে ডার্ক ম্যাটার ও এনার্জি মহাবিশ্বের ৯৫% জুড়ে বিরাজ করছে।

ব্ল্যাক হোল থেকে ডার্ক ম্যাটার সৃষ্টির কাল্পনিক ছবি

ডার্ক ম্যাটার সুপারপাওয়ারঃ

সুপারহিরো মুভিগুলোতে ডার্ক ম্যাটার নিয়ে অনেক ‘হাইপ’ দেখা গেলেও, প্রকৃতপক্ষে মানবদেহ ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির সংস্পর্শে আসলে, মানুষের দৃশ্যমান দেহের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। কারণ এ নিয়ে রীতিমত পুরোদস্তুর গবেষনা হয়েছে যেখানে পুরো ব্য্যাপারটা ব্যাখা করা হয়েছে।

আমাদের শরীরও মহাবিশ্বের অন্যান্য বস্তুর মতই অনু পরমানুর সমন্বয়ে গঠিত যা ইলেকট্রোমোটিভ ফোর্স দ্বারা যুক্ত, অন্যদিকে ডার্ক ম্যাটারের সংস্পর্শে আসলে এই ফোর্স বিলীন হয়ে যাবে, শুধু তাই-ই না আমাদের শরীর পারমাণমিক লেভেলে পরিবর্তিত হয়ে অদৃশ্য এক এনটিটিতে (ডার্ক এনার্জিতে) পরিনত হবে যার অস্তিত্ব অসীম সময় পর্যন্ত বিরাজ করবে।

     

ডার্ক ম্যাটারের সংস্পর্শে মানুষের ডার্ক এনার্জিতে ট্রান্সফরমেশনের কাল্পনিক ছবি

তবে ডার্ক ম্যাটার মানুষকে সুপার পাওয়ার দিতে পারবে না এটা ভেবে এখনই মন ক্ষুন্ন হবার কিছু নেই। বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, আজ যেটা অভাবনীয়, কালই সেটা হয়ে যাবে নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের পক্ষে এত শত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অনেকে দাবি করেন, ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বানোয়াট।

সুতরাং, স্বপ্নবাজ মানুষরা এখনো কল্পনা করে যেতেই পারে, হয়ত মানুষের শরীর ডার্ক ম্যাটারের সংস্পর্শে বিলীন হলেও কনশাসনেস (consciousness) ডার্ক এনার্জির সাথে মিশে যেতে পারবে, এক অর্থে মানুষ হতে পারবে মেটা-হিউম্যান কিংবা সুপারহিরো!